অবশেষে ধরা দিল স্বপ্ন। মাশরাফির অসাধারণ নৈপুণ্যে বাংলাদেশের দুর্দান্ত জয়

bd-masrafi

ব্যাট হাতে ঝড় তুললেন, সেই ঝড় অনূদিত বোলিংয়েও। ব্যাটিংয়ে মাশরাফি বিন মর্তুজার ঝড়ো ইনিংস বাংলাদেশকে দিয়েছিল লড়াইয়ের পুঁজি, বোলিংয়ের ঝড় মিরপুরে ছড়াল জয়ের সুরভী। টাইগার দলপতির ঝলকেই ২৩৮ রানের মামুলি পুঁজিটাও যথেষ্ট হলো ইংল্যান্ডকে আটকে দেয়ার জন্য। সফরকারীদের ইনিংস ২০৪ রানে গুঁড়িয়ে দিয়ে টাইগাররা ম্যাচ জিতল ৩৪ রানে, তিন ম্যাচের সিরিজে আনল ১-১ সমতা।
ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় পুঁজিটা ছিল ছোট, সেই পুঁজিটাকে ইংল্যান্ডের সামনে কঠিন করে তোলার জন্য বোলিংয়ে যেমন শুরুটা দরকার ছিল, মাশরাফি (৪/২৯) ঠিক সেটাই দিয়েছেন দলকে। তার দুর্ধর্ষ বোলিংয়ের কোনো জবাবই যেন ছিল না সফরকারী দলের টপঅর্ডার ব্যাটসম্যানদের কাছে। নিজের দ্বিতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম ওভারে নড়াইল এক্সপ্রেস ফিরিয়েছেন তিন ইংলিশ ব্যাটসম্যানকে।
জেমস ভিন্সকে মোসাদ্দেকের ক্যাচ বানিয়ে শুরু, এরপর এলবিডবিস্নউ আরেক ওপেনার জেসন রয়। আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান বেন স্টোকসকে তো উইকেটে দাঁড়াতেই দিলেন এই ডানহাতি এই পেসার। রানের খাতা খোলার আগেই ওই ইংলিশ ব্যাটসম্যানের স্টাম্প উপড়ে ফেলেছেন তিনি। মাঝে সাকিব আল হাসানের শিকার বেন ডাকেট, ২৬ রানে ৪ উইকেট তুলে নেয়ার পরই ম্যাচটা নাগালে পেয়ে যায় টাইগাররা।
অধিনায়ক জস বাটলার আর জনি বেয়ারস্টোর ৭৯ রানের পঞ্চম উইকেট জুটি যথেষ্টই ভীতি ছড়িয়েছে এরপর, সেটা দলের পুঁজি কিছুটা ছোট ছিল বলেই। তবে ওই জুটিটা ভেঙে যাওয়ার পর আর পেছন ফিরে দেখতে হয়নি টাইগারদের। সময় যত গড়িয়েছে ততই পরিস্কার হয়েছে তাদের জয়ের পথ। ইংল্যান্ডের পরবর্তী ব্যাটসম্যানরা ব্যস্ত থাকতে হয়েছে আসা-যাওয়ার মিছিলেই।
শুরুটা করেছিলেন মাশরাফি, শেষটা করলেন তাসকিন আহমেদ। হুমকি হয়ে ওঠা বাটলার-বেয়ারস্টোর জুটিটা ভেঙে ডানহাতি এই পেসারই উজ্জ্বল করেছেন জয়ের আশা। দারুণ এক ডেলিভারিতে বেয়ারস্টোকে উইকেটের পেছনে মুশফিকুর রহিমের হাতে ক্যাচ বানিয়েছেন তিনি। নাসির হোসেনের বলে সাকিবের দুর্দান্ত ক্যাচে ফিরেছেন মঈন আলী। গোটা স্টেডিয়াম তখন বাংলাদেশ… বাংলাদেশ… সস্নোগানে মুখোরিত। চলছিল জয়ের আগাম উদযাপন।
বাটলার উইকেটে থাকায় এরপরও শঙ্কা ছিল, ভীতিজাগানিয়া ব্যাটিং করে যাওয়া ইংলিশ অধিনায়ককে এলবিডবিস্নউর ফাঁদে ফেলে সেই শঙ্কাও উড়িয়ে দিয়েছেন তাসকিন। ৫৭ বলে ৫৭ রান করা এই ব্যাটসম্যান ফিরে যাওয়া, ম্যাচে তাসকিনের (৩/৪৭) তৃতীয় শিকার হয়ে ক্রিস ওকসের বিদায়; ১৩২ রানে ৮ উইকেট তুলে নেয়ার পর ম্যাচে বাংলাদেশের জয় ছিল কেবলই আনুষ্ঠানিকতা, সময়ের অপেক্ষা।
বিরক্তির ব্যাটিংয়ে সেই অপেক্ষা যথেষ্টই বাাড়িয়েছেন অতিথি শিবিরের লেজের দুই ব্যাটসম্যান আদিল রশিদ (৩৩*) আর ডেভিড উইলি (৯)। তৃতীয় ওয়ানডে আর প্রথম টেস্টের জন্য চট্টগ্রামে উড়ে যাওয়ার আগে যেন ব্যাটিং অনুশীলনটা সেড়ে নিতে চাইলেন দুই ‘বোলার’! মোসাদ্দেকের শিকার হয়ে উইলি ফিরে যাওয়ার পর জ্যাক বল (২৮) খেলেছেন হাত খুলে। অবশেষে মাশরাফি এসেই বেধে দিয়েছেন তার হাত, সেড়েছেন টাইগারদের জয়ের আনুষ্ঠানিকতা।
বোলারদের হাত ধরে জয় এসেছে, তবে ব্যাটিং নিয়ে আক্ষেপ আর দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে এই ম্যাচ। উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য সহজ ছিল না। তবে চাইলে এখানেও যে রান করা যায় মাহমুদউল্লাহ সেটাই করে দেখিয়েছেন। ৭৫ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলেছেন এই ডানহাতি। শেষের দিকে দুটি চার আর তিনটি ছক্কায় ২৯ বলে ৪৪ রানের ঝড়ো ইনিংসে মাশরাফিও দেখিয়েছেন তার ব্যাটিংয়েও মরচে পড়েনি।
বাকিরা সেটা পারলেন না। এদিন টপঅর্ডার ব্যাটসম্যানরা পুরোপুরি ব্যর্থ। বেশির ভাগ ব্যাটসম্যানই উইকেট উপহার দিয়ে এসেছেন ইংলিশ বোলারদের। সাবধানি শুরুর পর আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান ইমরুল কায়েস (১১) অযথা পুল করতে গিয়ে ক্যাচ দিয়েছেন স্কয়ার লেগে। আরেক ওপেনার তামিম ইকবালও (১৪) তাই। সাবি্বর রহমান (৩) বোল্ড হলেন দৃষ্টিকটুভাবে।
৩৯ রানে তিন উইকেট পড়ে যাওয়ার পর শক্ত হাতে দলের হালটা ধরেছিলেন মাহমুদউল্লাহ। ছন্দের খোঁজে থাকা মুশফিকুর রহিমকে নিয়ে শুরু করেছিলেন প্রতিরোধপর্ব। উইকেটে এসে জ্যাক বলকে জোড়া বাউন্ডারি হাঁকিয়ে মুশফিক আভাস দিয়েছিলেন, এদিন ভালো কিছুই হবে। কিন্তু দেশের তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে চার হাজার ওয়ানডে রানের মাইলফলক স্পর্শ করা এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান আরও এবার আউট হলেন ক্রিজে সেট হয়ে গিয়ে।
জ্যাক বলকেই পুল করতে গিয়ে আউট মুশফিক। ২১ রান করা এই ব্যাটসম্যানের বিদায়ে ৫০ রানের প্রতিশ্রুতিশীল জুটিটির অপমৃত্যু। এরপর দ্রুতই বিদায় সাকিবের, সেটাও যথারীতি বেন স্টোকসকে উইকেট উপহার দিয়ে। ভাগ্যিস মাহমুদউল্লাহ নিজের উইকেট বিলিয়ে দেননি, লড়াই চালিয়ে গেছেন সাধ্যমতো। তরুণ মোসাদ্দেক হোসেনকে নিয়ে দারুণভাবেই এগোচ্ছিলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আরেকটি সেঞ্চুরি হাঁকানোর সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হচ্ছিল তাতে।
কিন্তু হলো না, ৭৫ রান করে মাহমুদউল্লাহ থেমে গেলেন আদিল রশিদের বলে। রিভিউ নিয়েও শেষরক্ষা হয়নি, ছয়টি চারে সাজানো এই ডানহাতির ৮৮ বলের ইনিংসটি শেষ হয়েছে তৃতীয় আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে। এরপর দ্রুত বিদায় মোসাদ্দেকেরও (২৯) বাংলাদেশ তখন ১৬৯ রানে সাত উইকেট হারিয়ে ঘোর বিপাকে। ২০০ রানের গ-ি পেরোনো নিয়েই তখন ঘোর সংশয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর মূল একাদশে ফেরা নাসির হোসেনকে নিয়ে সেই সংশয় উড়িয়ে দিয়েছেন মাশরাফি।
শুরুতে কিছুটা নড়বড়ে মনে হলেও ২৭ বলে দুটি চারে অপরাজিত ২৭ রানের ইনিংসে নাসির দেখিয়েছেন দলে ফেরার যৌক্তিকতা। অপরপ্রান্তে মাশরাফি চালিয়েছেন তা-ব। রান আউটের খড়গে পড়ে সেই তা-ব থেমেছে ইনিংসের মাত্র এক বল বাকি থাকতে। দলের বোলাররা ততক্ষণে লড়াইয়ের পুঁজিটা পেয়ে গেছে। তাসকিনকে নিয়ে সেখানেও নেতৃত্ব দিলেন মাশরাফি, দারুণ জয়ে দলকে ফেরালেন সিরিজে। তাতে আগামী বুধবার চট্টগ্রামে অনুষ্ঠেয় সিরিজের তৃতীয় ম্যাচটি বনে গেল অলিখিত ফাইনাল, ম্যাচ যার সিরিজ জয়ের হাসি তার।

Authors
Top