অভিজিৎ রায় এবং আমার জিজ্ঞাসা

Dr-Qaiyum-Parvez

কাইউম পারভেজ

অভিজিৎ রায় চলে গেলেন অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদের মত করেই। দেখুন, কেমন সাবলীলভাবে কথাটা বলে ফেললাম। এমনি করেই সবাই যেন বলছেন। যেন অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুটা হবারই কথা ছিলো। যেন আমরা সবাই এর জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে ছিলাম। অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদকে হত্যা করা হয়েছিল একই প্রক্রিয়ায়, প্রায় একই স্থানে, একই সময়ে (বই মেলার সময়ে) এক দশক আগে। আজো তার বিচার হয়নি। ব্লগার রাজীবকে তেমনিভাবে হত্যা করা হলো। তার হত্যাকারীদের ধরা হলো। জানা গেলো তারা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র। সে বিচারও হয়নি। তেমনি সাগর-রুনীহত্যারও বিচার হয়নি। দূর্ভাগ্যজনকভাবে এই হত্যাকান্ডগুলোর তদন্ত বিচার শাস্তি নির্ভর করে ক্ষমতাসীনরা এটাকে কীভাবে দেখছেন! কীভাবে নিচ্ছেন। রাজনৈতিকভাবে এ সকল হত্যাকান্ড কতখানি এগিয়ে বা পিছিয়ে দেবে তারওপর।
নইলে কেন এগুলোর বিচার হলোনা বা বিচারের কোন অগ্রগতি নেই? যদি যথাযথ বিচার হতো তাহলে কী অভিজিৎ রায়কে এমন নির্মমভাবে মরতে হতো? বইমেলা থেকে বেরিয়ে মিলন স্কয়ারে এসে চারিদিকে লোকজন পুলিশ পাহারায়। তারমধ্যে দুজন তরুণ অভিজিৎ রায় আর তার স্ত্রী রাফিদাকে কুপিয়ে চলেছে আর সবাই দাঁড়িয়ে থেকে দেখছে। একজন পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য – তিনি ভেবেছিলেন ওখানে মারামারি হচ্ছে-তাই তিনি আর ছুটে যাননি (?)। অস্থিতিশীল অশান্ত এ দেশটায় এমন একের পর এক ঘটনা ঘটতে ঘটতে মানুষ এমন হয়ে গেছে যে যা কিছুই ঘটুক তা সবার কাছেই ¯^াভাবিক। তাই শুরুতে সে কথাই বলছিলাম অভিজিৎ রায় বা এমন যে কেউ মারা যাবে তার জন্য যেন সবার অপেক্ষা এবং সেটা সাবলীল।
এটাই কী আমার দেশ? এ দেশ তো ক্রমশঃই লেবানন, আফগানিস্তানের পথে হাঁটছে। কেবল ক্ষমতা নিয়ে রশি টানাটানি করতে করতে চুয়াল্লিশ বছর পার করে দিলাম ওদিকে-‘আমারে বধিবে যে গোকূলে বাড়িছে সে।” আমাদের দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল তাদের ক্ষমতা এবং অস্তিত্বের ¯^ার্থে এদের ব্যবহার করছে। এবং এরা দু পক্ষই বলবে”এটা আমাদের রাজনৈতিক কৌশল”। কিন্ত সাপে যখন কাটে তখন কী দেখে কে কালা আর কে ধলা? এই যে জঙ্গী সন্ত্রাসী যারা, ওদের জিজ্ঞেস করুন তো একান্তে ওরা বড় দুই দলের কোনটাকে চায় বা পছন্দ করে? ওদের সাফ উত্তর কোনটাকেই না। শেষ দুটোকেই করবো আগে আর পরে। আমরা আমাদেরমত তালেবানী মার্কা রাষ্ট্র তৈরী করবো। — সেভাবেই তারা এগুচ্ছে।
এ কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই কেন জানি একটা জিজ্ঞাসা এসে দাাঁড়ালো। আসলে কী কোন জঙ্গী সন্ত্রাসী বা ¯^ঘোষিত আনসারউল্লাহ দল এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে নাকি অন্য কেউ ওদের ঘাড়ে বন্দুকটা রেখে ফায়ার করে দিয়েছে। আমাদের দেশের নষ্ট রাজনীতির আধুনিক ফিলোজফি হলো লাশের রাজনীতি। রাজনীতিতে জিততে হলেই লাশ ফেলতে হবে। অবশ্য লাশ ফেলতে পারলে কাজও হয়। তবে নির্ভর করছে লাশটা কোথায় পড়ছে। ঢাকার বাইরে লাশ পড়লে তেমন একটা কাজে লাগে না। তার জন্য দু একটা মানব বন্ধন আর বিবৃতি টক শো দিলেই শেষ হয়ে যায়। লাশ ঢাকায় পড়লে বিশেষ করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় বা তার আসে পাশে পড়লেই কাজ হয়ে যায়। স্মরণ করে দেখুন ¯ৈ^রাচার এরশাদের পতন কখন ত্বরাšি^ত হলো? যখন ডা. মিলন তেমনই একটা জায়গায় খুন হলেন। তারপরের খবর তো সবার জানা।
এবারে আরেক টকশো নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না সাদেক হোসেন খোকার সাথে টেলিফোন আলোচনায় তেমনই একটা ইঙ্গিত দিলেন। অর্থাৎ ঢাকা ব্শি^বিদ্যালয়ে ২-৩টে লাশ ফেলতে পারলেই নাকি ওঁদের পেট্রোল বোমার আন্দোলন আরো বেগ পাবে এবং সরকার পড়ে যাবে। আমার জিজ্ঞাসা এমন তো হয়নি যে ঘটনা তাঁদের পক্ষ থেকে কোন তথাকথিত সলিমুল্লাহ কে দিয়ে এ কাজ ঘটিয়ে আনসারউল্লাহর নামে বাজার গরম করে দিচ্ছেন? মনে রাখতে হবে সুযোগ পেলে এরা কাওকে ছাড়বে না। মান্না খোকা কেউ বাদ পড়বে না।
রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে চলে এসেছি যে প্রতিটি ঘটনা আমরা রাজনৈতিক দৃষ্টি দিয়ে বিচার করি। আমি যে দলের এমনকি নীরব সমর্থক সেদলের দৃষ্টি ভঙ্গীতেই আমার বিচার- বিশ্লেষন। ফলে আমরা অপশন টু বা আদার সাইড অব দি কয়েনের কথা ভুলেই গেছি। আমরা কী দলীয় দৃষ্টি ভঙ্গীতে সব না দেখে বাস্তবতা দিয়ে ভাবতে পারি না?
জামায়াত নির্ভরতা থেকে বিএনপি যদি সরে দাঁড়াতে পারতো তবে এদের উত্থান প্রতিহত করা যেতো। অ¯^ীকার করার উপায় নেই যে এক সময়ে এই জামায়াত নির্ভরতা আওয়ামীলীগেরও ছিলো। সেখানেই তো ওদের জয়। ওদের সর্বকালে ইউ ইন উইন ভাবছিলো কেবল বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করাতে ওদের একটু বেকায়দায় পড়তে হয়েছে। তবে ওরা ছাড়বার পাত্র নয়। পাহাড়ে পাহড়ে যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আর গোলাবারুদের মওজুদের খবর পাচ্ছি তাতে মনে হয় ওরা খুব বেশী দুরে নয়। শোনা যায় ওরা এখন প্রশাসনের মধ্যেও ঢুকে গেছে। আইন শৃক্সখলাবাহিনীতে নাকি ওদের বাস। সেদিন অভিজিৎ রায়ের নারকীয় হত্যাকান্ডের সময় যে পুলিশ যে জনতা ওখানে উপস্থিত ছিলো তাদের মধ্যে ওদের লোক ছিলনা এ কথাকী এখন আর হলপ করে বলতে পারবো?
তাই বলি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যথাশীঘ্র সম্ভব শেষ করতে হবে। প্রশাসনের দূর্বলতা খুঁজে বের করতে হবে। কোনভাবেই এই জঙ্গী সন্ত্রাসীদের কাছে হারমানা যাবে না। এটা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। সকলকেই একযোগে গাইতে হবে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি। আমি এ সোনার বাংলায় উগ্র মৌলবাদীদের হাতে ছেড়ে দেবো না দিতে পারি না।
আজ আমাদের শপথ হোক আমাদের চোখের সামনে আরএমন অভিজিৎ রায়কে মরতে দেবো না। আমার সোনার বাংলাকে তালেবানী বাংলা হতে দেবো না। এ দায়িত্ব যেমন আমাদের তেমন আওয়ামীলীগের তেমন বিএনপির। নইলে অভিজিৎ রায় কেন কারোরই রক্ষা নাই।

Authors
Top