আন্তর্জাতিক শিশু শ্রম বিরোধী দিবস

আন্তর্জাতিক শিশু শ্রম বিরোধী দিবস

অনলাইন ডেস্কঃ সংসারে অভাব, সবাই এক সঙ্গে খাইতে পারতাম না। মায়-আব্বায় ঝগড়া করে। হের পর লেহাপরা (লেখাপড়া) বন্ধ কইরা হুন্ডার গ্যারেজে কাম (কাজ) শুরু করছি। এই হানে যেকালে (যে সময়) কাম শুরু করছি, হে সময় আমি ক্লাস থ্রি তে পরতাম। এই ৪ বছর এই হানে (এখানে) কাম করি, এহন মোটামুটি কাম পারি। তয় এহনও ল্যাহাপরা করতে মোন চায়। আমি ল্যাহা পরা করতে না পারলেও ভালো লাগে যে এহন আমরা চাইর ভাই বুইন এক লগে বইয়া প্যাড ভইরা ভাত খাইতে পারি।’ এ কথাগুলো ১৩ বছরের মোটরসাইকেল গ্যারেজ শ্রমিক শিশু রুবেলের। সংসারে অভাবের কারণে ৯ বছর বয়স থেকে রুবেল শহরের পাওয়ার হাউজ রোড এলাকায় মোটর গ্যারেজে কাজ নেয়।

রুবেল জানান, সদর উপজেলার খলিশাখালী গ্রামে তাদের বাড়ি। বাবার নাম শহিদ হোসেন। পেশায় একজন শ্রমিক। সংসারে ছয় জন সদস্য। এর মধ্যে রুবেল বড়। বাবা শহিদের আয়ে সংসারের ব্যয় মেটানো দায়। এ কারণে অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের আধপেটা কিংবা অভুক্ত দিন কাটাতে হতো। সংসারের অভাব মেটাতে বাবা শহিদ ৯ বছরের শিশু সন্তানকে স্কুলের পরির্বতে কাজে পাঠায়। শুরুতে রুবেলকে প্রতিদিন ৩০ টাকা বেতন দেয়া হতো। হাতুরি, ঝালাই আর ভারি যন্ত্রপাতির কাজ করতে গিয়ে বহুবার আহত হয়েছে শিশু রুবেল। কাজ শিখে তিন বছরে রুবেল নিজেকে অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছে। তাই আয়ও বেড়েছে।

এভাবেই দারিদ্রতার কারণে প্রতিনিয়ত শিশুরা শিক্ষা থেকে বিমুখ হয়ে শ্রমে জড়িয়ে যাচ্ছে। পটুয়াখালী জেলায় প্রায় ৪শর অধিক মোটরসাইকেল ওয়ার্কশপ ও গ্যারেজ রয়েছে। ওইসব প্রতিষ্ঠানে দুইজন করে শিশু শ্রমিক কাজ করে। এরফলে পটুয়াখালীতে শুধু মোটরসাইকেল গ্যারেজে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা আছে প্রায় ৮শ।

এছাড়াও ইটভাটা, বিড়ি শ্রমিক, রিকশার চালক, ওয়েলডিং কারখানা, হিউমান হলারের চালক ও ইমারত শ্রমিকের মতো নানা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় শহুরে জীবনে শিশু শ্রমিকরা জড়িয়ে আছে। শ্রমের বাজারে শিশুরা শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ নেই। আয়ের ধান্ধায় উত্তাল নদীতেও মাছ ধরে পরিবারের সহযোগী আয়ের সদস্য হিসেবে অর্থের যোগান দেয় তারা। নদী তীরবর্তী জেলে পরিবারের অধিকাংশ শিশুরা ঝুঁকি নিয়ে নদীতে মাছ শিকার করে। দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অনেক শিশু মারাও যায়। তবুও থেমে নেই তাদের এ জীবিকা। তবে জেলায় এসব ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় কতো শিশু কাজ করছেন এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই সরকারের কোনো বিভাগের কাছে।


ঝুঁকিপূর্ণ এসব পেশায় নিয়োজিত শিশুরা বলছে, পরিবারের অভাব অনটন আর পেটের দায়ের বাধ্য হয়ে এসব কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন তারা।

কুয়াকাটা এলাকার সাগড় পাড়ের জেলে সোবাহান ফকির বলেন, ‘আমাগো তো উপায় নাই। মাছ তো সব সময় পাওন যায় না। এ লইগা পরিবারের খরচ মিডাইতে গুরা গারা লইয়া মাছ ধরি। আমি সাগড়ে যাই আর ওরা চড়ে রেনুপোনা ধরে।’

এসব প্রান্তিক আয়ের পরিবারগুলোর শিশুদের ভবিষ্যৎ মানে কালো অন্ধকার। স্কুল, বই-খাতা কিংবা বিনোদনের জন্য খেলার মাঠে দৌড়ঝাঁপ এসব শ্রমজীবী শিশুদের জীবনে অনুপস্থিত প্রায়। অধিকার নিয়ে বেড়ে ওঠা তাদের জন্য বিলাসিতা। তাই জীবনের তাগিদে জীবিকার সন্ধানে ঝুঁকছে এসব পেশায়।

তবে শহরের ইকবাল অটোসের মালিক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমরাও এভাবে শিশু বয়স থেকে কাজ করতে করতে এখন ওয়ার্কশপের মালিক হইছি। তবে দিনে এসব শিশুরা কাজ করলেও রাতে যেন অন্তত প্রাথমিক শিক্ষাটা নিতে পারে সে বিষয়ে সরকারের একটু ভেবে দেখা উচিত।’

শিশুশ্রম প্রতিরোধ করার বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহিদা বেগম জানান, শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে ফিরিয়ে আনতে দরিদ্র পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করতে ইউনিসেফের অর্থায়নে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাতৃ-পিতৃহীন ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম নামে একটি পাইলট প্রকল্প চালু হয়েছে। এই পাইলট প্রকল্পটির মাধ্যমে গলচিপা উপজেলার চিকনিকান্দি এলাকায় অতি দরিদ্র ১২৪ পরিবারের মধ্যে ৩টি শর্তে মাসিক ২ হাজার টাকা করে প্রদান করা হচ্ছে। তাদের মোট ২৪ মাস এ অনুদান প্রদান করা হবে।

শর্ত গুলো হচ্ছে- ৬ থেকে ১৪ বছরের শিশুকে অবশ্যই বিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে। শিশুকে অর্থনৈতিক বা শ্রমে নিয়োজিত করা যাবে না এবং শিশুকে বিবাহ দেয়া বা করানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

তবে এই কর্মকর্তা মনে করছেন, প্রকল্পটি পুরো জেলায় শুরু করলে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে ফেরানো সম্ভব হবে। এর ফলে সঠিকভাবে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ঘটবে।

 

Authors
  
Top