আমড়া গাছে আম ধরবে না !

Golam Murtaza

গোলাম মোর্তোজা : আম গাছ থেকে আম-ই হবে, জাম গাছ থেকে জাম। আম গাছে আমড়া ধরবে না, জাম গাছেও জাম্বুরা নয়। সর্ষের বীজ থেকে সর্ষেই হবে, ধান হবে না।

একটি দেশ সমাজ সেভাবে গড়ে তুলছেন, সেই দেশ সমাজ তেমনই হবে। একজন আকায়েদ উল্লাহ যখন সামনে আসে, তখন আমরা ভীষণ চিন্তায় পড়ে যাই। এই সমাজ যে আকায়েদ উল্লাহদেরই তৈরি করছে, সেদিকে খেয়াল রাখি না। সেসব নিয়ে কোনও কথাও বলি না। সকল রকম অন্যায়কে জাস্টিফাই করার একটা ঊর্বর ভূমি প্রস্তুত করে, একটি অপকর্ম দেখে আতঙ্কিত হয়ে উঠছি। সর্বত্র একটা স্ববিরোধী অবস্থান। সাংবাদিক-শিক্ষক চোখের সামনে সত্যটা দেখে-জেনে, টেলিভিশনে গিয়ে অসত্য বলে- লেখে। আর আমাদের রাজনীতি তো অসতার গবেষণাগার। একদিকে ধর্মীয় আবরণ, আরেকদিকে অসত্য বলার প্রতিযোগিতা– এরই নাম বাংলাদেশের রাজনীতি। সরকারি কর্মচারীরাও এখন প্রকাশ্যে সেই রাজনীতির অংশ।

এমন প্রেক্ষাপটে দু’একটি বিষয় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা।

১. উত্তর আমেরিকা তো বটেই সারা পৃথিবীর প্রবাসীদের কাছে আকায়েদ উল্লাহ এখন আতঙ্কের নাম। বাংলাদেশের পুলিশ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অনুসন্ধান করে বলেছে, আকায়েদ উল্লাহ দেশে থাকতে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল না। কাজটা ভালো করেছে পুলিশ। প্রশ্ন হলো, আকায়েদ উল্লাহরা তৈরি হচ্ছে কেন?

এদেশে সাম্প্রদায়িকতাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার রাজনীতি শুরু করে বিএনপি। আওয়ামী লীগ তুলনামূলকভাবে সম্প্রদায়িকতা থেকে কিছুটা হলেও নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু জনগণকে বাদ দিয়ে ভোটারবিহীন নির্বাচনের আয়োজন করে, সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া আওয়ামী লীগ সাম্প্রদায়িকতাকে আঁকড়ে ধরেছে। ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িকতাকে ধারণ করে পৃষ্ঠপোষকতা করছে। আওয়ামী লীগ প্রমাণ করতে চাইছে বাংলাদেশে বিএনপির চেয়ে শক্তিশালী হেফাজতে ইসলামী। এক সময় যেমন নিয়ন্ত্রিত জঙ্গিবাদ রেখে সুবিধা নেওয়ার নীতি নেওয়া হয়েছিল, এখন সাম্প্রদায়িকতাকে ধারণ-পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে সুবিধা নেওয়ার নীতি নিয়েছে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় আজীবন থেকে যাওয়ার জন্যে আওয়ামী লীগ, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যে বিএনপি যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করছে, তা দিয়ে একজন নয় শত শত আকায়েদ উল্লাহ তৈরি হতে পারে।

জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অপারেশন, কিছু জঙ্গি হত্যা করে জঙ্গিবাদ থেকে মুক্তি মিলবে না। মুক্তি মেলার জন্যে রাষ্ট্রের সর্বত্র যে নীতি-নৈতিকতার প্রতিষ্ঠা দরকার, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত রাজনীতি দরকার, তার কোনও রকম উপস্থিতি নেই বাংলাদেশে।
বাংলাদেশ থেকে যারা বহু দূরে প্রবাসে থাকছেন, তারাও এই দেশের রাজনীতি মুক্ত থাকছেন না।

২. বলতেই পারেন, শুধু দেশের রাজনীতির কারণে তো আর আকায়েদ উল্লাহের জন্ম হচ্ছে না। হ্যাঁ, একদম ঠিক কথা। আকায়েদ উল্লাহদের জন্মের মূল কারিগর তো আমেরিকাই। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ট্রাম্প স্বীকৃতি দিল বলেই তো আকায়েদ উল্লাহ আক্রমণ করতে গেলো, বলা যেতে পারে এভাবেও।

সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তানে আসা, আমেরিকার তালেবান- আল কায়েদা তৈরি করা- সব কিছু পরিকল্পিত স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট রাজনীতির অংশ। আইএসের জন্ম দিল আমেরিকা, রাশিয়া এলো আইএস মারতে, কোনোটার উদ্দেশ্যই সৎ নয়। যার যার প্রভাব- আর্থিক লাভের হিসেবই মূখ্য। এই নীতির সফলই তো আল কায়েদা, তালেবান, আইএস। এসব তো বৃহৎ শক্তির স্বার্থের খেলাধুলা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কি কিছু করার আছে?

হ্যাঁ, এসব বৃহৎ শক্তির খেলা এবং বাংলাদেশের অবশ্যই কিছু করার আছে, ছিল।

বাংলাদেশ ট্রাম্প পুতিনের নীতি পরিবর্তন করতে পারবে না। বাংলাদেশ তার নিজের নীতি পরিবর্তন করতে পারে। বিএনপি বাংলা ভাইদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে জন্ম দিয়েছিল, নিজেদের লাভ বিবেচনায় নিয়ে। সেটা বুমেরাং হয়েছিল। বাংলা ভাইদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ ‘জঙ্গিবাদ আছে’ আমাকে ক্ষমতায় না রাখলে জঙ্গিবাদ বাড়বে, এই নীতি নিয়ে ভুল করেছিল। নিয়ন্ত্রিত জঙ্গিবাদও আওয়ামী লীগের ভুলনীতি। সাম্প্রদায়িকতার পৃষ্ঠপোষকতাও আওয়ামী লীগের ভুল নীতি। এখন ক্ষমতায় থাকার জন্যে সহায়ক মনে করলেও, আগামী দিনের জন্যে তা ভয়ঙ্কর রকমের ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে সাঁওতালদের (গাইবান্ধা) ঘরে আগুন দেওয়ানোর রাজনীতি, বুমেরাং হতে বাধ্য। অপহরণ- গুম- হত্যার ( নারায়ণগঞ্জ) দায় নিয়ে নায্যতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। হিন্দুদের বাড়ি পুড়িয়ে অন্যের ওপর দায় চাপানোর রাজনীতি করে তো আর অসাম্প্রদায়িকতার দেশ- সমাজ গড়া যায় না।

আওয়ামী লীগ-বিএনপি বড় দুটি রাজনৈতিক দল যদি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি থেকে দূরে সরে না আসে, পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া বন্ধ না করে, আকায়েদ উল্লাহদের বিস্তার কমবে না। ট্রাম্পের নীতির প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। তবে বাংলাদেশ যদি অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ধারণ করে, নাগরিকরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে- হয়ত জঙ্গি হবে না।

প্রবাসী যারা পৃথিবীর যে প্রান্তেই আছেন, তারা দেশের এই অসুস্থ, অসৎ অনৈতিক রাজনীতি থেকে নিজেদের দূরে না রাখলে, মূল্য আপনাদেরই সবচেয়ে বেশি দিতে হবে।

৩. একটি দেশের নাগরিক সমাজ, যারা বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এদেশে এমন অবস্থা বিরাজমান ছিল। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পরাজয়ের শেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করে দিয়ে গেছে। পাকিস্তানিদের হয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধটা করেছিল জামায়াত ইসলাম। হত্যা করেছিল এদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান শিক্ষক-সাংবাদিক-ডাক্তার-বুদ্ধিজীবীদের। তাদের অবর্তমানে যারা বুদ্ধিজীবীর সিল গায়ে লাগিয়েছিল, অল্প কয়েকজন ছাড়া তারা ছিল গুরুতর ‘ভণ্ড’। তারা পদ পদবির কাছে বিবেক বিক্রির ব্যবসা করেছে। বর্তমান সময়ে এসে যা প্রকোট থাকার ধারণা করেছে। দু’তিন জন ছাড়া এখনকার বুদ্ধিজীবী শ্রেণি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন না, নিজেরা অন্যায় করেন। জানেন সত্যটা, বলেন মিথ্যাটা। রাজনৈতিক দলের হত্যা-দুর্নীতি, অন্যায়-অনৈতিকতা সমর্থন করে সাধারণ মানুষের কাছে তারা এখন বিবেকহীন ‘দলদাস’।

একটি জাতির নীতি-নৈতিকতা সম্পন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত। শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ নেই। যাও দু’একজন আছেন, তাদের অসম্মান করাই হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সমাজ- রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মানুষের অধপতন ঘটিয়ে কিছু অবকাঠামো নির্মাণের নাম দেওয়া হয়েছে ‘উন্নয়ন’।

এত রক্ত এত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত একটি দেশ, প্রপাগান্ডা সর্বস্ব ‘এগিয়ে যাওয়া’র ভ্রান্তি বিলাসে ডুবে যাচ্ছে। মানুষ তৈরির উদ্যোগ নেই, প্রতিষ্ঠান নেই। শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া হলো। কেমন হবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ? কর্ম অনুযায়ী তো পরিচিত নির্ধারণ হয়!

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক। বাংলাট্রিবিউন

Authors
Top