খালেদার সাক্ষ্যের ইতি কোরআনের আয়াতে

khalada zia at court 1

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আসামি হিসেবে আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজের বক্তব্য মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনের আয়াত দিয়ে শেষ করেছেন খালেদা জিয়া, যাতে বলা হয়েছে ‘আল্লাহ সব দেখেন’।
মঙ্গলবার পুরান ঢাকার বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের মাঠে স্থাপিত ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিশেষ এজলাসে একটানা তিন ঘণ্টা বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

শেষে সুরা নিসার ১৩৪ নম্বর আয়াত পড়ে শুনিয়ে নিজের বক্তব্যের সমাপ্তি টানেন খালেদা জিয়া। এই আয়াতের অর্থÑ “আল্লাহর কাছে ইহকাল ও পরকাল উভয় কালের পুরস্কার রয়েছে। আল্লাহ সর্বদা সবকিছু শোনেন ও দেখেন।”
তার আগে তিনি এই মামলার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘বাদী আমার বিরুদ্ধে জবানবন্দিতে বলেছেনÑ আমার দুই ছেলে এবং আত্মীয় মুমিনুর রহমানকে দিয়ে আমি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন করিয়েছি। এ কথা আমার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধানমন্ত্রী এবং তার মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজন সদস্য বলে থাকেন। এগুলো সব ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও মনগড়া।’
খালেদা জিয়ার বক্তব্য শোনা শেষ করার পর বিচারক মো. আখতারুজ্জামান দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য ১৯, ২০ ও ২১ ডিসেম্বর দিন ঠিক করে দেন।
যুক্তিতর্ক শুনানির মধ্য দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা মামলাটির বিচার শেষ পর্যায়ে উপনীত হচ্ছে।
এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলাটি করে দুদক। ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ আদালতে অভিযোগপত্র দেন।
তার পাঁচ বছর পর ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদাসহ ছয় আসামির বিচার শুরু হয়।
অন্য আসামিরা হলেনÑ খালেদার বড় ছেলে তারেক রহমান, সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান, মাগুরার সাবেক সাংসদ কাজী সালিমুল হক কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ।
মঙ্গলবার সকালে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদের পর আত্মপক্ষ সমর্থনে সপ্তম দিনের মতো বক্তব্য রাখার সুযোগ পান খালেদা।
অর্থ আত্মসাতের যে অভিযোগ করা হয়েছে, সেই অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, কুয়েতের আমির ওই অনুদান জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে দিয়েছিলেন। এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
‘আমি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের কোনো সেটেলার বা ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যও নই। এই ট্রাস্টের তহবিল সংগ্রহ, পরিচালনা বা কোনো লেনদেনের সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কখনো সম্পৃক্ত ছিলাম না। আমি ট্রাস্টে কখনো কোনো অর্থ দিইনি। লেনদেনে কোনো স্বাক্ষর করিনি।’
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে বগুড়া বা অন্য কোথাও জমি কেনা-বেচার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ বাদী ও একই সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ দেখাতে পারেননি বলেও দাবি করেন খালেদা।
“কোনোরকম প্রমাণাদি ছাড়াই হারুন অর রশীদ মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্র দিয়েছেন। আমার বিরুদ্ধে একটা ভিত্তিহীন অভিযোগ এনেছেন আমি নাকি আমার পুত্রদ্বয় ও আত্মীয় মমিনুর রহমানকে দিয়ে অরফানেজ ট্রাস্ট বানিয়েছি।’
খালেদা বলেন, ‘আমি যেহেতু অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন করিনি, কাজেই আমার সৎ কিংবা অসৎ কোনো উদ্দেশ্য থাকার সুযোগ নেই। এর মাধ্যমে নিজে লাভবান হওয়া বা অন্য কাউকে লাভবান করারও কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে না।’
দুদক কর্মকর্তা নিরপেক্ষতা লঙ্ঘন করে কোনো দালিলিক প্রমাণ ছাড়া ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক’ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন বলে দাবি করেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
‘চাকরিতে পদোন্নতি ও ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার জন্য অসৎ উদ্দেশ্যে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক মহলের ইচ্ছা ও নির্দেশ অনুযায়ী এ সব করেছেন তিনি। আমি এই মিথ্যা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছি।’
বিচারকের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাসহ অন্যান্য বিচার ব্যবস্থার ফলাফল সাক্ষ্যনির্ভর। কেবল দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন অনুসন্ধানকারী এবং পরবর্তী সময়ে তদন্ত কর্মকর্তার দাখিল করা অভিযোগপত্রের উপর নির্ভর করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার কোনো নিয়ম নেই।’
খালেদা জিয়ার বক্তব্য শেষে রাষ্ট্রপক্ষে দুদকের কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল মঙ্গলবারই যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু করতে বিচারকের কাছে দাবি জানান। তবে আসামিপক্ষের তীব্র আপত্তিতে তা তলিয়ে যায়।
মামলাটির দীর্ঘ শুনানির কথা তুলে কাজল বলেন, ‘আর কত? আট বছর ধরে বিচার চলছে। আর ম্যাডামের (খালেদা) এত বড়, ডিটেইল আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্যেই তো যুক্তিতর্ক হয়ে গেছে। নতুন করে আর যুক্তিতর্ক শুনানির দরকার কী?’
বিচারক রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের কাছে যুক্তিতর্কের তারিখ নির্ধারণে সহায়তা চাইলে আসামিপক্ষের আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, ১৪ ডিসেম্বর থেকে সুপ্রিম কোর্টে ছুটি শুরু হবে। সেই ছুটির আগে যেন তারিখ না পড়ে।
তখন কাজল বলেন, ‘উনারা সুপ্রিম কোর্ট বন্ধ হওয়ার বিষয় ভাবছেন। ম্যাডাম সামনেই বসে আছেন। তার মামলা ফেলে আপনারা আপনাদের ব্যবসার (আইন ব্যবসা) কথা ভাবছেন!’
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন প্রত্যুত্তরে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কম কথা নয়। কীভাবে কী ভাষায় কথা বলতে হয়, তা উনার (কাজল) জানা উচিত। এ কথা আইন পেশার বিরুদ্ধে যায়।’
এ সময় আসামিপক্ষের ২৫/ ৩০ আইনজীবী ‘শেইম’ ‘শেইম’ বলতে থাকলে তাদের থামিয়ে দেয়া হয়।
খালেদার অন্য আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন দুদকের আইনজীবী কাজলের আসনের কাছে এসে বলেন, ‘এই আপনি এভাবে কথা বললেন কেন? আপনি কীভাবে এরশাদসহ অন্যদের পক্ষে লড়াই করেছিলেন, মনে নেই।’
দুই পক্ষের বাদানুবাদ থামিয়ে বিচারক যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য ১৯, ২০ ও ২১ ডিসেম্বর দিন ঠিক করে আদালতের দিনের কার্যক্রমের ইতি টানেন।
একই আদালতে খালেদার বিরুদ্ধে দুদকের করা আরেকটি মামলা জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট মামলার বিচারও চলছে।
তার আইনজীবীরা জানান, ওই মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনকে আত্মপক্ষ সমর্থনে লিখিত বক্তব্য জমা দিতে বলেছে আদালত। এ মামলাতেও ১৯ ডিসেম্বর তারিখ রাখা হয়েছে। সেদিন খালেদার আত্মপক্ষ সমর্থনে মৌখিক বক্তব্য দেয়ার সুযোগ চাওয়া হবে।
জিয়া দাতব্য ট্রাস্টের নামে আসা ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় এই মামলাটি হয়। ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি খালেদাসহ চারজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়ার পর ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ শুরু হয় বিচার।

Authors
  
Top