জাতিসংঘের বিবৃতি-রোহিঙ্গা নির্যাতন মানবতাবিরোধী অপরাধ

maynmar-3

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চালানো নির্যাতন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শামিল বলে মন্তব্য করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস হাইকমিশনার’-এর অফিস থেকে এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, মিয়ানমারে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যে রক্তাক্ত সহিংসতায় আন্তর্জাতিক উদ্বেগে অং সান সুচি সরকারের সুনাম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

এতে বলা হয়, ‘রোহিঙ্গাদের ওপর বার্মা সরকারের চালানো দমন-পীড়ন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শামিল।’
গত জুন মাসের একটি রিপোর্টের তথ্য পুনর্ব্যক্ত করে এতে বলা হয়, ‘সরকার মূলত জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে…। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের ধরন স্পষ্টতই মানবতাবিরোধী অপরাধ।’
জাতিসংঘের সাবেক প্রধান কফি আনান গত আগস্টে সপ্তাহব্যাপী ওই এলাকা পরিদর্শন করে ওই প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন। পরিদর্শন শেষে তিনি রাখাইনে সহিংসতায় ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেন।
চলতি মাসে পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্য সংখ্যালঘু হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর রক্তাক্ত নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। তাদের অমানবিক নির্যাতনে বাধ্য হয়ে এসব অসহায় রোহিঙ্গারা সীমান্ত অতিক্রম করে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে শত শত রোহিঙ্গা গণধর্ষণ, ভয়ংকর নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে উঠে আসছে।
সাম্প্রতিক নির্যাতনে প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে এবং উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে কয়েক হাজার ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে।
মিয়ানমারের সরকারি কর্মকর্তারা নির্যাতনের এসব অভিযোগকে অস্বীকার করে বলেছে, সেনাবাহিনী পুলিশের ওপর হামলার পেছনে জড়িত ‘সন্ত্রাসীদের’ হত্যা করছে।
ধর্ষণ ও হত্যার খবরে দেশটির সরকার মিডিয়াকে দায়ী করছে এবং রোহিঙ্গা মুসলমানদের ‘জাতিগতভাবে নির্মূল’ করতে মিয়ানমার সরকার হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে- এমন বিবৃতি দেয়ায় বাংলাদেশে জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে মিয়ানমার। গণধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ তদন্ত করতে বিদেশি সাংবাদিক, স্বাধীন তদন্ত সংস্থা ও মানবাধিকার কর্মীদের এসব অঞ্চলে প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে দেয়া হচ্ছে না।
কয়েক প্রজন্ম ধরে এসব রোহিঙ্গা বার্মায় বসবাস করে আসছে। তারপরও তাদের নাগরিকত্বকে স্বীকার করা হয়নি। তারা বিবাহ, ধর্মপালন, সন্তান জন্মদানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তারা সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগণ হিসেবে বসবাস করছেন।
২০১২ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয় এবং এরপর থেকে তারা পুলিশ পাহারায় দারিদ্র্যপীড়িত ক্যাম্পে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। সেখানে তারা স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং তাদের আন্দোলনকে প্রচ-ভাবে দমিয়ে রাখা হয়েছে।
তাদের কেউ কেউ ক্যাম্প থেকে নৌকায় করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু অনেকে শেষ পর্যন্ত মানব পাচার কিংবা মুক্তিপণের শিকার হয়েছেন।
এপারে আসছে রোহিঙ্গা
টেকনাফ (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, মিয়ানামরের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সে দেশের সৈন্যরা ববর্রতা চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বিচারে জবাই-গুলি করে হত্যা, ধর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। এসব নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে রোহিঙ্গারা গ্রাম ছেড়ে পাহাড়ে জঙ্গলে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে।
বুধবার রাতে ও ভোরে টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে হাজারখানেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। এদের মধ্যে তিন শতাধিক আশ্রয় নিয়েছে টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। একাধিক সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে, এদের মধ্যে দালালের হাত ধরে শিশুসহ ৩০ মিয়ানমারের নাগরিক বাংলাদেশে ঢোকে। তারা সকালে কক্সবাজারের টেকনাফ লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিবিরে এসে পেঁৗছেন। এ সময় কথা হয় হাসিনা বেগমের সঙ্গে। তখন তিনি কাঁদছিলেন। তার বাড়ি মিয়ানমারের মংডু শহরের পুংদু গ্রামে।
হাসিনা বেগম বলেন, মিয়ানমারের সৈন্যরা তার স্বামী মো. রফিককে জবাই করে হত্যা করেছে। ওরা অপর এক নারী ছমিরা বেগমকে ধর্ষণ করে। তাকেও ধর্ষণ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তিনি তাদের হাত থেকে পালিয়ে রক্ষা পান। তারা একসঙ্গে শিশুসহ প্রায় ১৫ জনকে গুলি ও জবাই করে হত্যা করেছে।
তাদের দলের মো. ইয়াছিন বাবাকে হারিয়ে প্রাণে বেঁচে থাকতে ছোট বোন মোকারামকে (৯) নিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেন। তারা এখানে কোথাও আশ্রয় পাননি। তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো দেশ নেই ঘরবাড়ি ও পরিবার ছেড়ে প্রাণরক্ষার জন্য বাংলাদেশে চলে আসতে হলো। এখানেও কোথাও জায়গা হলো না। সৈন্যরা কত রোহিঙ্গা নাগরিকদের মেরে ফেলা হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। অনেক পরিবারের লোকজন এখনো নিখোঁজ রয়েছে।’ এর পর তার বাবা রশিদ আহমেদের ওপর নৃশংস, বর্বর নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি কেঁদে ফেলেন।
তিনি অভিযোগ করেন, মিয়ানমারের সৈন্যরা-সন্ত্রাসীরা রোহিঙ্গা মুসলিমদের জবাই, আগুনে পুড়িয়ে, গুলি করে হত্যা ও নারীদের ধর্ষণ-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। তারা যেদিন যে পাড়ায় খুশি রাতের বেলা ঢুকে ঘরে আগুন দেয়। এরপর গুলি করে, জবাই করে হত্যা করছে। তারা হত্যা করে মাটি খুঁড়ে এক গর্তে ১০-২০ জনকে কবর দিচ্ছে।
টেকনাফ লেদা ক্যাম্পের বাসিন্দারা জানান, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানের কারণে সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। বেশির ভাগ রোহিঙ্গা রাতের অাঁধারে কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছেন। তবে এখন সীমান্তে আরও বেশি নজরদারি বৃদ্ধি করায় উপকূল দিয়ে রোঙ্গিরা ঢুকছেন। তারা আরও জানান, টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে সোমবার ভোর ও সকালে প্রায় হাজারখানেক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। এর আগে মিয়ানমারের চলমান পরিস্থিতির পর থেকে প্রায় ১০ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করতে পারে বলে ধারণা করেন তারা।
টেকনাফ-২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর আবু রাসেল ছিদ্দিকী জানান, বুধবার ভোরে নাফ নদীর ৩টি পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকালে রোহিঙ্গাবোঝাই ৫টি রোহিঙ্গা নৌকাকে বাধা প্রদান করা হয়েছে। এতে তারা বাংলাদেশে ঢুকতে না পেরে মিয়ানমারে ফেরত যায়। যেসব পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গারা বেশি প্রবেশের চেষ্টা করছে সেসব পয়েন্টে বিজিবির সর্বোচ্চ নজরদারি আছে। পাশাপাশি সীমান্তজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। যাযাদি।

Authors
Top