টাইগারদের রুদ্ধশ্বাস জয়

bd-cricket

ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামে সেই দুঃস্বপ্নটাই যেন ফিরে আসছিল। ২০১৪ সালে এশিয়া কাপে দুই দলের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশকে যেভাবে পরাজয়ের লজ্জায় ডুবিয়েছিল কাবুলিওয়ালার দেশ আফগানিস্তান, রোববার তারই পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চলেছিল তারা। শেষতক তা হয়নি। জিতেছে বাংলাদেশ। কষ্টে পাওয়া ৭ রানের জয়ে তিন ম্যাচ সিরিজে এগিয়েও গেছে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল।
জয় ধরা দিয়েছে, জয়ের যে ধারায় বাংলাদেশ ছিল অব্যাহত থেকেছে সেই ধারাও। তবে প্রত্যাশার পুরোটা কি মেটাতে পেরেছে টাইগাররা? ঘরের মাঠে বিগত কয়েকটি সিরিজে পাকিস্তান, ভারত আর দক্ষিণ আফ্রিকাকে যেভাবে নাস্তানাবুদ করেছিল মাশরাফি ব্রিগেড, রোববার মিরপুরে ‘পুচকে’ আফগানিস্তানের বিপক্ষে সেই দাপুটে পারফরম্যান্স দেখা গেল কই? ব্যাটিংয়ের শুরুটা হলো দারুণ, কিন্তু শেষটা থেকে গেল বড় আক্ষেপ হয়ে।

প্রত্যাশিত মাত্রা না পেলেও শেরেবাংলায় টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের ২৬৫ রানের পুঁজিটা নেহায়েত মন্দ ছিল না। কিন্তু রহমত শাহ আর হাসমতউল্লাহ শাহিদির ‘হৃদয়ভাঙা’ ব্যাটিংয়ে সেটা যেন হয়ে গেল মামুলি! স্বাগতিক বোলাররা যদিও আফগান ব্যাটসম্যানদের অতিক্রম করতে দেয়নি তা, তবে কালঘাম ছুটে গেছে একেবারে। আসগর স্টানিকজাইয়ের দল শেষতক থেমেছে ২৫৮ রানে।

মোহাম্মদ শাহজাদের বিধ্বংসী সূচনা সামলে বোলিংয়ে শুরুটা একেবারে মন্দ ছিল না বাংলাদেশের। ২১ বলে ৩১ রান করা আফগান ওপেনারকে মাশরাফি ফিরিয়ে দেয়ার পর আরেক ওপেনার সাবির নুরিকেও সাজঘরে পাঠিয়েছিলেন সাকিব। কিন্তু তখন কে জানত গলার কাঁটা হয়ে উঠবেন পরের দুই ব্যাটসম্যান রহমত শাহ আর হাসমতউল্লাহ শাহিদি! তৃতীয় উইকেটে তাদের শতরানোর্ধ্ব রেকর্ড জুটি ম্যাচের দৃশ্যপটটাই পাল্টে দিয়েছে।
স্বাগতিক ফিল্ডারদেরও দায় আছে, আফগানদের ৪৬ রানের উদ্বোধনী জুটি ভেঙে যেত পারত ২ রানেই। তাসকিন আহমেদের বলে ক্যাচ তুলেছিলেন শাহজাদ কিন্তু সস্নিপে দাঁড়িয়ে সেটা নিতে পারলেন না ইমরুল কায়েস। তিনি ক্যাচটা নিতে পারলে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে এই ম্যাচ দিয়েই পুনরায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরা তাসকিন হয়তো বাড়তি আত্মবিশ্বাস পেতেন। নতুন জীবন পেয়ে উল্টো এই পেসারের আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দিয়েছেন শাহজাদ।
তাসকিনের প্রত্যাবর্তনের শুরুটা হয়েছে ভুলে যাওয়ার মতো, দীর্ঘদিন পর দলে ফেরা আরেক পেসার রুবেল হোসেনেরও তাই। যদিও শেষে চার উইকেট নিয়েছেন তাসকিন। উইকেটের দেখা পেয়েছেন রুবেলও। তবে দুজনেই রান বিলিয়েছেন উদারহস্তে। দলপতি মাশরাফি, সাকিব আর তাইজুল ইসলাম নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে যে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, সেই চাপ তাই আর ধরে রাখা যায়নি শুরুতে। আফগানরাই রাজত্ব করে গেছে ম্যাচে, মাঠে টাইগারদের প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে ভীষণ উৎকণ্ঠায়।
মাত্র ৯টি ওয়ানডে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশে আসা হাসমতউল্লাহ খেললেন ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস, ১৫তম ওয়ানডে খেলতে নামা রহমতের ব্যাট পাত্তাই দিতে চাইল না স্বাগতিক বোলারদের। তৃতীয় উইকেটে তাদের ১৪৪ রানের জুটি ম্যাচটাকে বাংলাদেশের নাগালের বাইরে নিয়ে গেল প্রায়। তবে ‘ওস্তাদের মারের’ মতো তখনো শেষের ঝলকটা বাকি ছিল টাইগারদের।
সাবেক সতীর্থ আব্দুর রাজ্জাককে পেরিয়ে ওয়ানডেতে দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হওয়ার পথে সাকিব ভেঙেছেন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা জুটিটি। উইকেটের পেছনে মুশফিকের গ্লাভসবন্দি হওয়ার আগে ৯৩ বলে ২টি চার আর ৩টি ছক্কায় ৭১ রান করেছেন রহমত। এরপর তাইজুল ফিরিয়েছেন ৭২ রান করা হাসমতউল্লাহকে। এরপরও মোহাম্মদ নবী যেভাবে ব্যাটিং করছিলেন, মনে হচ্ছিল বড্ড দেরি হয়ে গেছে। তবে দারুণভাবে ইতি টেনে মাশরাফি ব্রিডেগ জানিয়ে দিল, সব ঠিকই ছিল।
নবিবুল্লাহ জাদরানকে ফেরালেন মাশরাফি, এরপর ৩০ রান করা নবী আর আফগান দলপতি স্টানিকজাইকে নিজের শিকার বানিয়েছেন তাসকিন। উইকেট দখলের লড়াইয়ে শেষ বেলায় যোগ দিয়েছেন রুবেলও। শেষ ওভারে জয়ের জন্য ১৩ রান দরকার ছিল আফগানদের, প্রথম বলেই তাসকিন ফিরিয়েছেন মিরওয়াইজ আশরাফকে, শেষ বলে তার শিকার দৌতল জাদরান। সবমিলে ওই ওভার থেকে ৮ রানের বেশি নিতে পারেনি অতিথিরা, জয় নিয়েই মাঠ ছেড়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের পুঁজিটা আরেকটু বড় হলে ম্যাচটা এত কঠিন হতো না। কিন্তু লোয়ার মিডল অর্ডারের ব্যাটসম্যানরা নিজেদের সামর্থ্যের সামান্যটুকুও অনূদিত করতে পারলেন না মাঠে। একটা সময় দলের পুঁজি ৩০০ রান ছাড়িয়ে যাওয়াটাকে সহজ মনে হচ্ছিল তামিম-মাহমুদউল্লাহদের ব্যাটে কিন্তু লোয়ার-মিডল অর্ডারের ব্যর্থতায় বাংলাদেশ থামল অনেকটা আগে। মুশফিকুর রহিম আর সাবি্বর রহমান হয়ে থাকলেন নিজের ছায়া। ওপেনার সৌম্য সরকার তো দীর্ঘদিন ধরেই হারিয়ে খুঁজছেন নিজেকে।
আরও একবার ব্যর্থ ওপেনিং জুটি। ইনিংসের প্রথম ওভারে দৌলত জাদরানকে তুলে মারতে গিয়ে সাবির নুরির তালুবন্দি সৌম্য। শুরুর এই ধাক্কাটা অবশ্য দারুণভাবেই সামলেছেন তামিম ইকবাল। ইমরুল কায়েসের সঙ্গে তার ৮৩ রানের জুটি বাংলাদেশকে দাঁড় করিয়েছে শক্ত ভিতে। ৩৭ রানের ইনিংসে ইমরুল স্বাচ্ছন্দ্যে ছিলেন, এটা অবশ্য বলা যাবে না, আউট হওয়ার মতো অন্তত তিনটি সহজ সুযোগ দিয়েছেন এই বাঁহাতি।
ব্যক্তিগত ৩০ রানের মাথায় জীবন পাওয়া তামিম অবশ্য বেশ সাবলীল ছিলেন। মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে তার ৭৯ রানের অনবদ্য জুটিটা বাংলাদেশকে দেখিয়েছে বড় পুঁজি গড়ার পথ। ৩৫ ওভার শেষে দলের স্কোর ছিল ২ উইকেটে ১৬৩। তিনশ ঊর্ধ্ব পুঁজি গড়াটাকে তখন মনে হচ্ছিল খুব সহজ। তামিম যেভাবে খেলছিলেন আরও ভালো কিছুরই প্রত্যাশা ছিল।
প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৯ হাজার রানের মাইলফলক ছোঁয়া তামিম দিনটা রাঙাতে পারতেন সেঞ্চুরির রঙে। ক্যারিয়ারের ৩৩তম হাফসেঞ্চুরি তুলে নেয়ার পর যেভাবে এগোচ্ছিলেন বাঁহাতি ওপেনার, তিন অংকের ম্যাজিক ফিগার ছোঁয়াটাকে মনে হচ্ছিল সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু পারলেন না তামিম, খেই হারালেন ৩৬তম ওভারের প্রথম বলেই। মিরওয়াইজ আশরাফকে উইকেট উপহার দিয়ে ৮০ রানে থামলেন তিনি।
মাহমুদউল্লাহ-সাকিব আল হাসানের ৪০ রানের জুটি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়েছে ঠিক, শক্ত ভিতটা নড়বড়ে হয়ে গেছে তামিমের বিদায়ের পরই। ৭৪ বলে ৫টি চার আর ২টি ছক্কায় ৬২ রান করা মাহমুদউল্লাহ বিদায় নেয়ার পরই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে গেছে। এরপর দ্রুত মুশফিক-সাবি্বরের বিদায়; আফগানদের কাঁধে বড় রানের বোঝা চাপিয়ে দেয়ার পথ বন্ধ ওখানেই।
সাকিব ছিলেন, শেষপর্যন্ত এই বাঁহাতি থাকতে পারলে হয়তো আরও কিছুটা সমৃদ্ধ হতো পুঁজি। তাতে তিনি নিজেও আরেকটি হাফসেঞ্চুরি বঞ্চিত হওয়ার আক্ষেপে পুড়তেন না। এটাও ঠিক, ৩টি চারের সাজানো ৪০ বলে তার ৪৮ রানের ইনিংসটি সময়ের দাবি মিটিয়েছে। কিন্তু বাকিরা পারেননি, তাই শেষ ১০ ওভার থেকে বাংলাদেশ তুলতে পারল মাত্র ৬৯ রান। উইকেট পড়ল গুনে গুনে সাতটি।
শেষের এই ব্যাটিং ব্যর্থতাই ম্যাচটাকে কঠিন করে তুলেছে বাংলাদেশের জন্য। লম্বা বিরতিতে যে জং ধরেছে পারফরম্যান্সে, প্রমাণ মিলল তারও।

Authors
  
Top