নাজমুলের বক্তব্যকে অসত্য বললেন হাতুরাসিংহে

hathurosinha

শুরুতে খটমট লাগলেও যত দিন গড়িয়েছে, ততই বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গনে চন্দিকা হাতুরাসিংহের ঘনিষ্ঠ হয়েছেন খালেদ মাহমুদ। সেই তিনি হেড কোচের চলে যাওয়ার এত দিন পরও বিস্মিত, ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় একবারের জন্যও চলে যাওয়ার ব্যাপারে সামান্যতম ইঙ্গিতও দেয়নি হাথু!’

বিপুল অঙ্কের বেতন-সুবিধা আর অসীম ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে হাতুরাসিংহে কেন শ্রীলঙ্কার টলায়মান কোচের চেয়ারে বসতে গেলেন, এ নিয়ে বিস্ময় আছে জাতীয় দলের ক্রিকেটার মহলেও।

অবশ্য বিদায়ী সফরে ঢাকায় আসা হাতুরাসিংহের সঙ্গে একান্ত সভার পর বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান যা জানিয়েছিলেন, তার সারমর্ম সিনিয়র কয়েকজন ক্রিকেটারের ওপর নাখোশ হয়েই চাকরি পাল্টেছেন চন্দিকা হাতুরাসিংহে। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে টেস্ট সিরিজ থেকে সাকিব আল হাসানের নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়াটা নাকি পছন্দ হয়নি কোচের। তবে সম্প্রতি ক্রিকবাজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অবশ্য এই শ্রীলঙ্কান সরাসরি সেসব নাকচ করে দিয়েছেন, ‘এসব মোটেও সত্যি নয়। মিস্টার নাজমুল হাসান চালাক মানুষ, বুদ্ধিমানও। এসব তিনি হয়তো অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বলেছেন। হতে পারে, সাকিবের ভেতরের আগুন বের করার জন্য তিনি এমনটা বলেছেন। সাকিবকে তো দেখছি টেস্টের অধিনায়ক করা হয়েছে। উনার এসব বলার পেছনে বিশেষ কোনো কারণ থাকতে পারে। জটিল পরিস্থিতি উনি দারুণভাবে সামাল দিতে পারেন।’

তার মানে, সেদিন রাজধানীর একটি হোটেলে বিদায়ী কোচের সঙ্গে আলোচনার পর সাকিবকে ঘিরে যা বলেছেন বোর্ড সভাপতি, তা অসত্য কিংবা মিথ্যা। নাকি, এত দিন পর হাতুরাসিংহের এই বক্তব্যও অসত্য। হতে পারে, শ্রীলঙ্কার কোচ হিসেবে প্রথম সফরেই বাংলাদেশে আসার আগে জাতীয় দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের মনে জ্বলতে থাকার ঘৃণার আগুন নেভাতেই এসব বলছেন হাতুরাসিংহে। আসলে কে সত্য আর অসত্য বলছেন—সেটা নিরূপণই দুঃসাধ্য হয়ে গেছে! তাতে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটেও হয়েছে।

এটা বোধগম্য যে সফল কোচ হাতুরাসিংহের পদত্যাগের পেছনে সিনিয়র ক্রিকেটারদের ‘কারসাজি’ প্রচারণা পেলে তাঁরা জনরোষে পড়বেন। আর তেমনটা হলে তারকা ক্রিকেটারদের ‘শাসন’ করাটা সহজ হয়ে যাবে। পরিতাপের বিষয় হলো, বিদায়বেলায় গোপনে সাকিব কিংবা সিনিয়র ক্রিকেটারদের নিন্দামন্দ করে উল্টো জনরোষে পড়েছেন হাতুরাসিংহে। তাঁর আচমকা চুক্তি ভেঙে পদত্যাগ এবং সিনিয়রদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোটা অনুমোদন করেনি আমজনতা থেকে শুরু করে মিডিয়াও। বরং বিদায়ী কোচের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে জনতার বিরাগভাজনও হয়েছেন বিসিবি সভাপতি। ভারতীয় একটি অনলাইন মাধ্যমে চন্দিকা হাতুরাসিংহের সবশেষ সাক্ষাৎকারে নাজমুল হাসানের বক্তব্য যেভাবে খণ্ডিত হয়েছে, তাতে সেই বিরাগ নিশ্চিতভাবেই আরো বেড়েছে। এতে কার কী লাভ হলো, বলা মুশকিল। তবে কিছু ক্ষতি নিশ্চিতভাবেই হয়েছে। দলের মধ্যে প্রত্যাশিত সুসম্পর্কের সুবাতাস আগের মতো বইছে না। এতে অবশ্য বোর্ড কর্তাদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ কায়েম সহজতর হয়েছে কিংবা হবে!

তার পরও সুখের জীবন ফেলে চন্দিকা হাতুরাসিংহে কেন চলে গেলেন, এই কৌতূহল এখনো দমেনি। একটা দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ খারাপ হতেই কোচ পালিয়ে বাঁচলেন, এই যুক্তি ধোপে টেকে না। ক্রিকেট মানচিত্রের ওপ্রান্তে খুব কম দলেরই সাফল্যের ইতিহাস রয়েছে। তাহলে কি বিসিবি সভাপতির উদ্ধৃতিই সত্য কাহিনি? ‘কী জানি? তবে আমার সঙ্গে কয়েক দিন আগে কথা হয়েছে। তখন হাথু বলছিল যে, ওর মায়ের শরীর খারাপ। ঢাকায় আনার ব্যাপারে রাজি করাতে পারেনি। তাই শ্রীলঙ্কার অফারটা নিয়েছে’, গতকাল বলছিলেন খালেদ মাহমুদ। একই বেতনে নিজের দেশে মায়ের সান্নিধ্য পেতে চাকরি বদলাতে পারেন যে কেউই। কারণ হিসেবে সাকিব কিংবা সিনিয়র ক্রিকেটারদের ওপর ক্ষোভ এবং অভিমান থেকে হাতুরাসিংহের পদত্যাগের পেছনে মায়ের কোলে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। অবশ্য তাঁর ঘরে ফেরা কতটা আনন্দদায়ক এবং টেকসই হবে, তা নিয়ে রয়েছে ঘোর সংশয়। ক্ষমতা আপাতত লঙ্কান বোর্ডও দিয়েছে হাতুরাসিংহেকে। কিন্তু দ্বীপ দেশটির ক্রিকেটের সর্বময় ক্ষমতাও তো তাদের ক্রিকেট প্রশাসকদের হাতে নেই, ছড়ি ঘোরায় ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। এই যেমন, কিছুদিন আগেই ভারতগামী দলকে বিমানবন্দর থেকে ফিরে আসতে হয়েছে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেই বলে! তাতে নতুন চাকরিতে হাতুরাসিংহের দীর্ঘায়ু দেখছেন না তাঁর ঘনিষ্ঠজনরাও।

অবশ্য আপাতত শ্রীলঙ্কার জাতীয় দলের ওপর প্রভূত ক্ষমতার চর্চা করছেন চন্দিকা হাতুরাসিংহে। অনুশীলনে ক্রিকেটারদের গান শোনার রীতি বন্ধ করেছেন প্র্যাকটিসের প্রথম দিনই। ক্রিকেটারদের আত্মনিবেদনের ওপর বরাবরই জোর দেন হাতুরাসিংহে। দীনেশ চান্ডিমাল-অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজদের ওপরই তাই শ্যেনদৃষ্টি থাকবে তাঁদের নতুন কোচের। শ্রীলঙ্কাকে সাফল্যের চূড়ায় তুলে নেওয়ার রোডম্যাপও তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন হাতুরাসিংহে। তিনি সফল নাকি ব্যর্থ হবেন, তা সময়ই বলবে।

Authors
Top