পুলিশের কাছে ধরা দিয়েছে মেয়ে ঐশী। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় খুন হলেন মা-বাবা!

Ose

পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না রহমান হত্যার ঘটনায় তাঁদের মেয়ে ঐশী রহমানের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ।পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে ঐশী বলেছে, না জানিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাফেরা করা এবং ইয়াবা সেবনের কারণে তাকে বাসায় আটকে রাখা হতো। মা-বাবার এই কড়াকড়ি শাসন তাকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। একপর্যায়ে সে বন্ধুদের নিয়ে মা-বাবাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে। খুনের আগে মা-বাবাকে কফির সঙ্গে চেতনানাশক খাওয়ানো হয়।এই খুনের ঘটনায় ঐশীসহ ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গতকাল শনিবার রাত আটটার দিকে রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করেন ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে মাহফুজুর দম্পতির মেয়ে ঐশীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তবে হত্যার কারণ, হত্যায় কতজন জড়িত—এসব ব্যাপারে তদন্তের স্বার্থে এখন কিছু বলা যাচ্ছে না।

তবে হত্যার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় মাহফুজুর দম্পতিকে হত্যার পরিকল্পনা করে মেয়ে ঐশী ও তার বন্ধুরা। ঐশী ইয়াবা আসক্ত ছিল। নেশা করে গভীর রাতে বাসায় ফিরত। এ নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন মাহফুজুর দম্পতি। এ জন্য মাহফুজুর প্রায় সময় মেয়েকে বকাঝকা করতেন। কিন্তু মেয়েকে কোনোভাবেই মাদক থেকে বিরত রাখতে পারছিলেন না।

ওই কর্মকর্তা বলেন, মেয়ের এমন চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে কয়েক দিন আগে মাহফুজুর মেয়ের বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দেন। বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী ও তত্ত্বাবধায়ককে বলে দেন, তাঁর অনুমতি ছাড়া যেন তাঁদের সন্তানদের বাইরে যেতে না দেওয়া হয়। এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার বাইরে যেতে চেয়েছিল ঐশী। কিন্তু নিরাপত্তাকর্মীরা যেতে দেননি। এ নিয়ে বাবা-মায়ের ওপর বেশ ক্ষুব্ধ হয় সে। বিষয়টি বন্ধুদের জানানোর পর তারাও ক্ষুব্ধ হয়।

ওই কর্মকর্তা বলেন, গত বুধবার রাতে (১৪ আগস্ট) কফির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে তা মাহফুজুর ও তাঁর স্ত্রীকে খাওয়ানো হয়। কফি খাওয়ার পর তাঁরা অচেতন হয়ে পড়লে হত্যা করা হয়। ঐশী ও তার বন্ধুরা মিলে প্রথমে স্বপ্নাকে ১১টি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। পরে মাহফুজুরকে দুটি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।

হত্যার দৃশ্য দেখেছে বাসার গৃহকর্মী সুমি। তবে নিহত দম্পতির ছেলে ঐহী রহমান (৮) তখন ঘুমিয়ে ছিল। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে ঐহী ও সুমিকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে সিএনজিযোগে বের হয়ে যায় ঐশী।এই ছবি এখন শুধুই স্মৃতি। সন্তানদের সঙ্গে নিহত দম্পতি। সংগৃহীতদুই সন্তান ও গৃহকর্মীকে নিয়ে রাজধানীর ২ নম্বর চামেলীবাগের একটি বাড়ির ছয়তলার এক বাসায় থাকতেন মাহফুজ দম্পতি। লাশ উদ্ধারের পর গত শুক্রবার রাতে ওই বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক আমজাদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ৪ আগস্ট তিনি মাহফুজের কাছে বাসা ভাড়া আনতে গিয়েছিলেন। তখন মাহফুজ তাঁকে বলেছিলেন, তাঁর অনুমতি ছাড়া যেন তাঁর সন্তানদের বাইরে যেতে দেওয়া না হয়। বৃহস্পতিবার ঐশীরা বাসা থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলে তিনি স্বপ্নার নম্বরে ফোন করেন। তখন অপর প্রান্ত থেকে তাদের যেতে দিতে বলেন। এরপর ঐশীদের যেতে দেন তিনি। যাওয়ার সময় মিরপুরে খালাদের বাসায় যাচ্ছে বলে জানায় ঐশী।আমজাদ আরও বলেন, মুঠোফোনে অপর প্রান্ত থেকে আসা কণ্ঠটি স্বপ্নার ছিল কি না, তা তিনি ওই সময় পরখ করে দেখেননি। কিন্তু শুক্রবার বিকেলে যখন মাহফুজ দম্পতির খোঁজে আত্মীয়স্বজনেরা বাসায় আসেন, তখন তিনি আবারও ওই নম্বরে ফোন করেন। তখন ঐশী ফোন ধরে জানায়, তার বাবা-মা রাজশাহী গেছে। সে কাকরাইলে ঐহীকে নিয়ে এক বান্ধবীর বাসায় আছে। সুমিকে এক বস্তিতে রেখে আসা হয়েছে। শুক্রবার প্রথম আলোকে দেওয়া আমজাদ ও বাড়ির দুই নিরাপত্তাকর্মী মোতালিব ও শাহীনের বক্তব্য অনুযায়ী, বুধবার রাত থেকে অপরিচিত কাউকেই তাঁরা ওই বাসায় ঢুকতে কিংবা বের হতে দেখেননি। রাজধানীর চামেলীবাগের ওই বাড়িতে অপরিচিতদের অনুমতি নিয়েই ঢুকতে হয়। অপরিচিত কেউ এলে নিবন্ধন খাতায় নাম-ঠিকানা-মুঠোফোন নম্বর লিপিবদ্ধ করা হয়। পুলিশের ধারণা, বুধবার রাতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। সেই হিসাবে বুধবার থেকে শুক্রবার লাশ উদ্ধার পর্যন্ত ওই বাসায় কারও আসার নাম-ঠিকানা নিবন্ধন খাতায় লিপিবদ্ধ নেই। শুধু বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে ঐশীদের বের হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ আছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনার রহস্য আরও উন্মোচন করার জন্য বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক ও নিরাপত্তাকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

তবে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ বলেন, আঘাতের চিহ্ন দেখে মনে হচ্ছে, একাধিক ব্যক্তি এ হত্যায় জড়িত। স্বপ্নার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ১১টি ও মাহফুজের শরীরে দুটি ধারালো অস্ত্রের গভীর আঘাত রয়েছে। আঘাত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। দুজনের ভিসেরা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।

ঐশীর খালু ইফতেখারুল আলম শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেছিলেন, প্রায় সময় ঐশী গভীর রাতে বাসায় ফিরত। এ নিয়ে পারিবারিকভাবে বেশ সমস্যা চলছিল। গত রমজান মাসেও এ নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঐশীর বড় ধরনের হট্টগোল হয়।

গত শুক্রবার রাতে চামেলীবাগের বাসার দরজা ভেঙে বাথরুম থেকে মাহফুজ ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্নার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে ঐশী ও গৃহকর্মী সুমি নিখোঁজ ছিল। ওই সময় পুলিশ কর্মকর্তা ও নিহত দম্পতির স্বজনেরা জানান, মাহফুজুর এসবির রাজনৈতিক শাখায় কর্মরত ছিলেন। বুধবার রাত ১১টা পর্যন্ত দায়িত্ব শেষ করে তিনি বাসায় ফেরেন। এর পর থেকে তাঁর কোনো খোঁজ ছিল না। বাসার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। বৃহস্পতিবার সকালে ঐশীরা বাসা থেকে বের হয়ে যায়। ওই দিন রাতে উত্তরার বাসিন্দা খালু ইফতেখারুলকে মায়ের মুঠোফোন থেকে ফোন করে ঐশী জানায়, তার বাবা-মা রাজশাহীতে। তাদের ভয় লাগছে বলে কাকরাইলে আছে। ঐশী ইফতেখারুলের বাসার ঠিকানা জানতে চেয়ে সেখানে যাওয়ার কথা বলে। সন্দেহ হওয়ায় ইফতেখারুল তাঁর ভাই রবিউলকে মাহফুজের বাসায় পাঠান। রবিউল গিয়ে দেখেন, বাসার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। তখন রবিউল ঐশীকে ফোন করলে একেক সময় একেক কথা বলতে থাকে সে। পরে কাকরাইল থেকে রিকশায় করে ঐহীকে বাসায় পাঠিয়ে দেয় ঐশী। ঐহী আসার পর রবিউল ও রায়হান নামের মাহফুজুরের আরেক আত্মীয় মাহফুজের কর্মস্থল এসবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান।

যেভাবে আটক ঐশীসহ অন্যরা: পুলিশের কর্মকর্তারা বলেন, গতকাল বেলা দুইটার দিকে একটি মেয়ে হেঁটে এসে পল্টন থানায় ঢোকে। থানার মূল ফটকে তখন দায়িত্বে ছিলেন কনস্টেবল এমদাদুল হক। তিনি মেয়েটির পরিচয় জিজ্ঞেস করলে সে নিজের নাম ঐশী বলে জানায়।

এমদাদুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই মেয়েটি আমাকে এসে বলল, “আমি কিছু কথা বলতে চাই, কাকে বলব?” তখন আমি তার নাম-পরিচয় জানতে চাইলাম। মেয়েটি বলল, “আমার নাম ঐশী। আমি বাড্ডা থেকে এসেছি।” নাম বলা মাত্রই আমার আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না। পরে আমি তাকে নিয়ে থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে যাই।’

গতকাল রাত আটটায় যুগ্ম কমিশনার মনিরুল সাংবাদিকদের জানান, ঐশী ছাড়াও গৃহকর্মী ও ঐশীর বন্ধু রনি ওরফে জনিকে আটক করা হয়েছে। বাড়ির দুই নিরাপত্তাকর্মীসহ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

মনিরুল ইসলাম জানান, ওই বাসা থেকে স্বর্ণালংকারসহ কিছু মালামাল খোয়া গেছে। ঐশীর ব্যাগ থেকে কিছু মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।

মামলা: এ হত্যার ঘটনায় পল্টন থানায় মাহফুজুর রহমানের ছোট ভাই মশিহুর রহমান অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছেন।

Authors
Tags

Related posts

Top