পৌষের শীতেও বাঘ কাঁপছে। দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা তেঁতুলিয়ায় ২.৬

Panchagarh_cold-wave

আসি আসি বলেও আসছিল না শীত। ২০১৭ সালের বিদায়বেলায় ডিসেম্বর মাসে হালকা শীতের সঙ্গে গরম কিছুটা আঁচড় কেটেছিল। তবে সোমবার অবস্থা এমনই হলো যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে শীত পড়ার সব রেকর্ড ভেঙে গেল। তাই ‘মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে’ প্রবাদও বদলে হয়ে যেতে পারে- ‘পৌষের শীতে বাঘ কাঁপে’। কারণ, সোমবার ছিল কেবল ২৫ পৌষ। এখনো পড়ে আছে পুরো মাঘ মাস। তীব্র শীতের এই রেকর্ড ৫০ বছর ধরে রেখেছিল মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা। পাহাড়-টিলায় ঘেরা এই এলাকায় ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রম্নয়ারি তাপমাত্রা ছিল ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে এটিই ছিল বাংলাদেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড। এরপর প্রতিবছর তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেলেও দেশের কোথাও ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামার তথ্য আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে নেই। কিন্তু গতকাল এই রেকর্ড ভেঙে পঞ্চগড়ের তেঁতুুলিয়ার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি। ২০১৩ সালে অবশ্য ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা নেমে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। ওই বছর ১০ জানুয়ারি নীলফামারীর সৈয়দপুরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন ৯ জানুয়ারি দিনাজপুরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অবশ্য, বাংলাদেশে শূন্য ডিগ্রি বা এর কম তাপমাত্রা পড়ার সম্ভাবনা নেই বলে মন্ত্মব্য করেছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক শাহ আলম বলেন, বাংলাদেশে শীত পড়ার অনেক কারণ রয়েছে। এর একটি হলো সাইবেরিয়ার বাতাস। তবে বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগেই এই বাতাসে শীতের মাত্রা কমে যায়। কিন্তু এ সময় সাইবেরিয়ার বাতাসে যে মাত্রার ঠা-া থাকে, সেটি এ দেশের মানুষের কাছে সহনীয় নয়। এদিকে গতকাল যেন সারাদেশেই শীত জেঁকে বসে। আর কাঁপন ধরানো শীতের মাত্রা তুলনামূলক বেশি উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৪৩টি কেন্দ্রের মধ্যে নীলফামারীর সৈয়দপুরে সোমবার দেশের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন ছিল তাপমাত্রা ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই জেলার ডিমলায় ছিল ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৩ এবং দিনাজপুরে তাপমাত্রা ছিল ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রংপুরের পর শীতের তীব্রতা বেশি রাজশাহী বিভাগে। এই বিভাগের সবচেয়ে বেশি শীত পড়ে নওগাঁর বদলগাছীতে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া রাজশাহী জেলায় ছিল ৫ দশমিক ৩, বগুড়া ও ঈশ্বরদীতে ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। উত্তরের জেলায় শীতের তীব্রতা এতটাই বেশি যে, রাতের বেলায় আকাশ থেকে ঝরছে বৃষ্টির মতো কুয়াশা। দিনের বেলায়ও কুয়াশার রেশ কাটেনি। এর সঙ্গে উত্তর দিক থেকে আসছে কনকনে ঠা-া বাতাস। তাই স্বল্প আয়ের মানুষের ভরসা এখন আগুনের কু-লি। শীতের ছোবল থেকে বাঁচতে দিনরাত সব সময়ই তারা আগুনের কাছে দাঁড়িয়ে নিজেদের রক্ষা করছেন। পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, হাড়কাঁপানো শীতে এখানকার জীবনযাত্রা এখন অনেকটাই বিপর্যস্ত্ম হয়ে গেছে। চরম দুর্ভোগে পড়েছেন দরিদ্র, ছিন্নমূল, ভাসমান ও স্বল্প আয়ের মানুষ। জেলা শহরে সাধারণ মানুষ ও রাস্ত্মাঘাটে যানবাহন চলাচল কম করছে। তবে লেপতোশক এবং শীতবস্ত্রের দোকানগুলোয় ক্রেতাদের ভিড় বেড়ে গেছে। ঘন কুয়াশা আর শৈত্যপ্রবাহের কারণে বোরো ধানের বীজতলা হলুদ বর্ণ হয়ে মরে যাচ্ছে। আলুর খেতে লেটব্রাইট রোগসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামছুল হক বলেন, আলুক্ষেত লেটব্রাইট রোগ থেকে রক্ষা করতে কৃষি বিভাগ কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করছে। শীতের কারণে নানা ধরনের রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে জানিয়ে পঞ্চগড় জেলা সিভিল সার্জন মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, শীতের কারণে শিশু ও বৃদ্ধরা শীতজনিত নানা রোগ ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং হাঁপানিতে আক্রান্ত্ম রোগ বেশি দেখা যাচ্ছে। উত্তরের মতো দক্ষিণেও শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। চুয়াডাঙ্গায় ৫ দশমিক ৪, যশোরে ৫ দশমিক ৬, সাতক্ষীরায় ৭ দশমিক ৫ এবং খুলনায় ৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

Authors
Top