প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতায় ভারসাম্য চান খালেদা

khada zia 5

বিএনপির নতুন ধারার রাজনীতি ও অর্থনৈতিক বিপ্লবের রূপকল্প গণভোট চালু ও বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ সব কালাকানুন বাতিল করার অঙ্গীকার জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে কোনো রাষ্ট্র এদেশে হস্তক্ষেপ করলে কঠোর প্রতিরোধ গড়ার ঘোষণা একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা প্রস্তুত করা হবে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যমত গঠন করা হবে ২০৩০ সালের মধ্যে মাথাপিছু আয় ৫০০০ মার্কিন ডলারে উন্নীত করা হবে

আগামী ২০৩০ সালে দেশকে সমৃদ্ধির সোপানে নিয়ে যেতে ‘প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা’সহ ২৫৬ দফা সংবলিত ‘ভিশন-২০৩০’ রূপকল্প ঘোষণা করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। যেসব বাধা জনগণের মেধা, শ্রম, উদ্যোগ ও উৎসাহকে দমিয়ে দেয় সেগুলোকে দূর করে বাংলাদেশকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, আধুনিক ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে বিএনপির ‘ভিশন-২০৩০’ প্রণয়ন করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে ‘বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক বিধান’ যুক্ত করা হয়েছে, সেগুলো সংস্কার করার অঙ্গীকারও করেন বেগম জিয়া। তিনি গণভোট ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করার কথাও বলেন। পাশাপাশি জাতীয় সংসদকে কার্যকর করতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানান। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের অধীন পৃথক সচিবালয়, বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ সব কালাকানুন বাতিল এবং বিচার বহির্ভূত হত্যাকা-ের অবসান ঘটাবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি পুনঃপরীক্ষা করা হবে বলেও জানান তিনি।
বুধবার বিকালে রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে বিএনপি কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে- তার রূপকল্প ‘ভিশন-২০৩০’ দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতেই এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

এই রূপকল্প উপস্থাপনের শেষ পর্যায়ে এসে তিনি বলেন, ‘আমরা যে ভিশন উপস্থাপন করলাম তা অর্জনে কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। আমরা লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছি। এই দেশটাকে উন্নত ও মর্যাদাবান দেশে পরিণত করা আমাদের সকলের পবিত্র দায়িত্ব। আমরা আশা করি, এই ভিশন বাস্তবায়নে আমরা দেশবাসীর সক্রিয় সমর্থনের পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানসমূহেরও সহযোগিতা পাব।’

খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি জণগণের হাতেই রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দিতে চায়। তার দল ওয়ান ডে ডেমোক্রেসিতে বিশ্বাসী না। জনগণের ক্ষমতাকে শুধু ভোট দেয়ার দিনে আবদ্ধ রাখতে চায় না। কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং ‘গণতন্ত্রের চাইতে উন্নয়ন শ্রেয়’_ এ অজুহাতে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানোর অপচেষ্টা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি প্রতিহত করবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রতিশ্রুত দেন, তার দল রাষ্ট্রক্ষমতা পেলে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও কারা ব্যবস্থানায় সংস্কার আনার মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করবে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংবিধান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠা করা হবে ন্যায়পালের পদ।
তার অঙ্গীকার, তার দল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ বিশ্বে স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি। তাই দল ক্ষমতা গেলে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টির মাধ্যমে জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটন করা হবে। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ধর্মেও শিক্ষার প্রচার এবং শান্তি ও সম্প্রীতির চেতনাকে সুসংহত করার মধ্য দিয়ে সন্ত্রাস দমনের একটি কর্মকৌশল প্রণয়ন করবে বিএনপি।
তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী মতের নেতাকর্মীদের মদন-পীড়নে যখন আদালতকে ব্যবহার করা হচ্ছে তখন ক্ষমতাসীনদের দেয়া হচ্ছে দায়মুক্তি। দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলে তার দল সালিসি আদালত পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখবে।
২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে প্রথম এই ‘ভিশন ২০৩০’-এর রূপরেখার সার সংক্ষেপ দেন তিন মেয়াদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি মনে করে বাংলাদেশের জনগণ মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল আজ সে রাষ্ট্রের মালিকানা তাদের হাতে নেই। তাই জনগণের হাতেই দেশের মালিকানা ফিরিয়ে দিতে চায় বিএনপি।
বেগম জিয়া বলেন, বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোয় প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা এককভাবে প্রধানমন্ত্রীর ওপর ন্যস্ত। এরূপ ব্যবস্থা সংসদীয় সরকার পদ্ধতির স্বীকৃত রীতির পরিপন্থী। বিশেষ করে সামপ্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতায় দেশবাসী গভীরভাবে উপলব্ধি করছে যে, প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরণে একটি স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্ম দিয়েছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর সংবিধানের পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোট ব্যবস্থা বাতিল, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, সংসদ বহাল রেখে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান প্রবর্তন, সংবিধানের কিছু বিষয় সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ এবং সংবিধানের কতিপয় ধারা-উপধারা সংশোধনের অযোগ্য করার বিধান প্রবর্তন, উচ্চ আদালতের বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের উপর ন্যস্তকরণের বিধানসহ কয়েকটি অগণতান্ত্রিক বিধান প্রণয়ন করেছে। বিএনপি এসব বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক বিধানাবলী পর্যালোচনা ও পুনঃপরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার করবে।
জাতীয় সংসদকে সব জাতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থ সমপর্কিত বিষয়ে বিরোধী দলসমূহের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি এবং পাবলিক আন্ডারটেকিংস কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধী দলের সদস্যদের ওপর অর্পণ করা হবে। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে জাতিকে পেঁৗছতে সুনীতি, সুশাসন এবং সুসরকারের সমন্বয় ঘটাবে বিএনপি।
রূপকল্পে চট্টগ্রামে বঙ্গোপসাগরে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে একে একটি ‘রিজিওনাল হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা, সার্ক ও আশিয়ানভুক্ত দেশসমূহের সঙ্গে রেল ও সড়ক যোগাযোগের উদ্যোগ এবং চীনের ‘ওয়ান বেল্ট-ওয়ান রোড’ উদ্যোগে সংযুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা নেয়ার কথা উল্লেখ করেন বিএনপি প্রধান। একই সঙ্গে দ্বিতীয় যমুনা সেতু, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া প্রান্তে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, ব্রক্ষপুত্র সেতু, বুড়িগঙ্গা, মেঘনা, গোমতী ও কর্ণফুলী নদীর ওপর আরও সেতু নির্মাণ করা হবে। ‘এখনিক ট্যুরিজম’ ও ‘ওয়াটার ট্যুরিজম’ চালু করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে দুই ঘণ্টাব্যাপী বক্তব্যে ‘ভিশন-২০৩০’ রূপকল্প এর সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন খালেদা জিয়া। বিকাল ৪টা ৫০ মিনিটে শুরু করা এই সংবাদ সম্মেলনে চলে টানা ৬টা ৫২ মিনিট পর্যন্ত। এ সময়ে খালেদা জিয়া টানা লিখিত বক্তব্য পড়ে শুনান।
এই রূপকল্পটি বই আকারে প্রকাশ করা হয়। ৪১ পৃষ্ঠার এই রূপকল্পটি বাংলা ও ইংরেজি- এই দুই ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে।
‘ভিশন-২০৩০’ অগ্রাধিকার বিষয়গুলো হচ্ছে :
* জন-আকাঙ্ক্ষাকে মর্যাদা দিয়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করে রাষ্ট্র পরিচালনা
* প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনাতে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে।
* দ্বিকক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থা সংস্কারের অংশ হিসেবে সংসদের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে।
* গণভোটের ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হবে।
* সংসদকে জাতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত করতে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি ও পাবলিক আন্ডারকিংস কমিটির সভাপতিতাব বিরোধী দলের সদস্যদের ওপর অর্পণ করা হবে।
* সুশাসন, সুনীতি ও সুসরকারের (থ্রিজি) সমন্বয় ও বৃহত্তর জনগনের সম্মিলনের মাধ্যমে ‘ইনক্লুসিভ সোসাইটি’ গড়ে তোলা হবে।
* প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সৃষ্টি করতে সংবিধান অনুযায়ী ন্যায়পাল পদ সৃষ্টি করা হবে।
* বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৯৭৪ বাতিল করা হবে।
* বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করে জনগণের জন্য ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে। অধনস্ত আদালতকে নির্বাহী বিভাগের আওতামুক্ত করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় স্থাপন করা হবে।
* বিদ্যমান বিচারব্যবস্থার সংস্কারে একটি উচ্চ পর্যায়ের জুডিশিয়াল কমিশস গঠন করা হবে।
* পুলিশের ওপর বিচার বিভাগের তদারিক নিশ্চিত করে জবাবদিহি ও কল্যাণমূলক জনপ্রশাসন গড়ে তোলা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হবে।
* তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল করা হবে। বিএনপি সৎ সাংবাদিকতার পরিবেশ পুনরুদ্ধার করবে এবং চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনি হত্যাসহ সকল সাংবাদিক হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হবে।
* প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার জন্য মুক্ত চিন্তা ও গণতান্ত্রিক চেতনার সাথে সংগতিপূর্ণ একটি নীতিমালা প্রণয়নে সুপ্রিম কোর্টের একজন সাবেক বিচারপতির নেতৃত্বে এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ট নাগরিক, আইটি বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের সমন্বয়ে একটি কমিশন গঠন করা হবে।
* সস্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিএনপি বাংলাদেশের ভূখ-ের মধ্যে কোনোরকম সন্ত্রাসবাদী তৎপরতাকে বরদাশত করবে না এবং সন্ত্রাসবাদীকে আশ্রয়-প্রশয় দেবে না। একই সঙ্গে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গঠন এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপকে উৎসাহিত করবে।
* প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সমর-সম্ভারে সুসজ্জিত, সুসংগঠিত, যুগোপযোগী ও সর্বোচ্চ দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত করে গড়ে তোলা হবে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও সমপ্রসারণ করা হবে। জাতীয় উন্নয়নমূলক কর্মকা- ও আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় প্রতিরক্ষা বাহিনীর অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা হবে।
* বিএনপি অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ও অন্য কোনো রাষ্ট্রের জন্য নিরাপত্তা সমস্যা সৃষ্টি করবে না। একইভাবে তারা (বিএনপি) দৃঢ় অঙ্গীকার করছে যে, অন্য কোনো রাষ্ট্রও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যপারে হস্তক্ষেপ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করলে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়া হবে। মুসলিম উম্মাহ ও প্রতিবেশী দেশসমূহের সাথে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলবে বিএনপি।
* ?মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সম্মানিত নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করা হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নের নামে দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা প্রস্তত করা হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি এবং এই ভাতা ব্যবস্থাপনাকে দুর্নীতি ও ত্রুটিমুক্ত করা হবে।
* সারাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি রক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধকালীন বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিত করে সেসব স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে।
* ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা হবে। মাধাপিছু আয় ৫ হাজার মার্কিন ডলারে উন্নীত করা হবে। এরজন্য বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ডবল ডিজিটে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হবে।
* আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে শৃঙ্খলা আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, ক্ষমতা ও তদারকি নিবিড় ও শক্তিশালী করা হবে। ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ডিভিশন বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসমূহ পরিচালনা ও তদারকির ভার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে ন্যস্ত করা হবে।
* এক দশকের মধ্যে নিরক্ষরকা দূর করা এবং শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫% অর্থ ব্যয় করা হবে। মেয়েদের ও ছেলেদের জন্য স্নাতক ও সমপর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে। ছেলে ও মেয়েদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম সমপ্রসারণ করা হবে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হবে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে কম্পিউটার শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন, প্রত্যেক জেলায় একটি করে স্মার্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হবে।
* নেতৃত্ব তৈরি লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদের নির্বাহী নিশ্চিত করা হবে।
* প্রবাসীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
* নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, আইন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মতো সাংবিধানিক ও আধা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতি-অনিয়ম-দলীয়করণমুক্ত করা হবে।
* স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ‘ন্যায়পাল’ বা ‘ওম্বুডসম্যান’-এর পদ ও কার্যালয় সক্রিয় করা হবে।
* মেয়েদের জন্য স্নাতক ও ছেলেদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে। শিক্ষা সমপ্রসারণে জাতীয় টিভিতে পৃথক একটি চ্যানেল চালু করা হবে।
* স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা হবে। ক্ষমতা ও উন্নয়নের ভরকেন্দ্র হবে গ্রামমুখী।
* প্রণোদনার মাধ্যমে কৃষি খাতকে পুনর্বিন্যাস ও বিকশিত করা হবে।
* দ্রুত সময়ে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা হবে। পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য বীমা চালুক করা হবে। সকল নাগরিকদের জন্য জেনারেল প্রেকটিশনার (জিপি) ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একজন চিকিৎসক নির্দিষ্ট থাকবেন। গরিব মানুষের জন্য ৫০ ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধ বিনামূল্যে করা হবে।
* নারী নির্যাতন, যৌতুক প্রথা, এসিড নিক্ষেপ, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, নারী ও শিশু পাচার রোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। শিশুশ্রম রোধে কার্যকর বাস্তবানুগ পদক্ষেপ নেয়া হবে। শিশু সন্তান রেখে নারীরা যাতে নিশ্চিন্তে কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন সেজন্য অধিকসংখ্যক ডে কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলা হবে।
* জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার পর্যায়ক্রমে শূন্য শতাংশে কমিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
* বেকার যুবক-যুবতীর জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করবে। এক বছরব্যাপী অথবা কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত, যেটা আগে হবে, শিক্ষিত বেকারদের বেকার ভাতা প্রদান করা হবে।
* শহীদ জিয়ার খাল খনন কর্মসূচি আবার চালু করা হবে এবং শুকিয়ে যাওয়া বা পালিমাটিতে ভরাট হয়ে যাওয়া খাল-বিল, নদী-নালা ও হাজা-মজা পুকুর ও দিঘি পুনঃখনন করা হবে। পুরাতন ব্রক্ষপুত্র নদ, ধলেশ্বরী, গড়াই, মধুমতী, করতোয়া ইত্যাদি খনন করে পানি সংরক্ষণ জলাধার সৃষ্টি করা হবে।
* আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিৎসা আদায়ে বিএনপি আঞ্চলিক ও পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে আলাপ-আলোচনার উদ্যোগ নেবে। প্রয়োজনে শক্তিশালী কূটনৈতিক উদ্যোগও গ্রহণ করা হবে।
* সমুদ্র উদ্ভিদ ও প্রাণিসম্পদের মজুদ অর্থাৎ বস্নু ইকোনমি সম্পর্কে নিয়মিতভাবে বিজ্ঞানসম্মত জরিপ পরিচালনা করা হবে।
* ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনে আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তোলা হবে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে একটি সমন্বিত জাতীয় জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করা হবে। অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে যে সীমাহীন দুর্নীতি ও অনৈতিক দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে তার জন্য ইলেক্ট্রিসিটি অ্যান্ড এনার্জিস রেপিড সাপ্লাই ইনক্রিজ অ্যাক্ট-২০১০ পুনঃপরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে।
* বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশকে পারস্য উপ-সাগরীয় দেশসমূহ ইরান ও মধ্য এশিয়ার দেশসমূহ এবং পাকিস্তান ও ভারতের আন্তঃদেশীয় গ্যাস পাইপলাইনে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হবে।
* রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি পুনঃপরীক্ষা করা হবে।
* চট্টগ্রামে বঙ্গোপসাগরে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করে একে একটি ‘রিজিওনাল হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সার্ক ও আশিয়ানভুক্ত দেশসমূহের সাথে রেল ও সড়ক যোগাযোগের উদ্যোগ এবং চীনের ‘ওয়ান বেল্ট-ওয়ান রোড’ উদ্যোগে সংযুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা নেয়া হবে।
* দ্বিতীয় যমুনা সেতু, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া প্রান্তে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, ব্রক্ষপুত্র সেতু, বুড়িগঙ্গা, মেঘনা, গোমতী ও কর্ণফুলী নদীর ওপর আরো সেতু নির্মাণ করা হবে।
* ‘এখনিক ট্যুরিজম’ ও ‘ওয়াটার ট্যুরিজম’ চালু করা হবে।
গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলের বলরুমে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বিএনপিসহ ২০-দলীয় জোটের বাইরে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাদের দেখা যায়নি। অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতা ছিলেন না। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, সুইজারল্যান্ড, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ৩০ দেশের কূটনৈতিকরাও ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, অধ্যাপক নুরুল আমিন, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ, বিডি নিউজ২৪ ডট কমের সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদি, দৈনিক যায়যায়দিনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কাজী রুকুনউদ্দীন আহমেদ, মানব কণ্ঠের সম্পাদক আনিস আলমগীর, ও দৈনিক প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপির নেতাদের মধ্যে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার, তরিকুল ইসলাম, মাহবুবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান, শাহজাহান ওমর, হাফিজউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সেলিমা রহমান, মোহাম্মদ শাহজাহান ছিলেন।
২০-দলীয় জোটের নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আন্দালিব রহমান পার্থ, সৈয়দ মুহম্মদ ইবরাহি, মোস্তফা জামাল হায়দার, এম এ রকীব, সৈয়দ মজিবুর রহমান, শফিউল আলম প্রধান, রেদোয়ান আহমেদ, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জেবেল রহমান গনি, আজহারুল ইসলাম, আবু তাহের চৌধুরী, সৈয়দ মাহবুব হোসেন, সাঈদ আহমেদ, মুফতি মো. ওয়াক্কাস, সাইফুদ্দিন মনি।

Authors
Top