বর্ষা বেলার কাব্য

২ নং

**১**

বর্ষা এলেই আমারে ডুবে যেতে ইচ্ছে করে। ডুব দিতে ইচ্ছে করে স্মৃতিতে। সুনীলের মত আমারও শৈশবে শৈশবের কোন স্মৃতি ছিলনা। তাই হয়তো ছোটবেলার বর্ষাগুলো দিনমান বৃষ্টির ঝাপসা দৃষ্টি হয়ে স্মৃতিতে আছে।

মনে নেই ঠিক কোনদিন বৃষ্টিতে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধটা আমার নাকে আসে। তবে সেদিন থেকেই বুঝি আমার মস্তিস্কের কোষে পাগলামি বাসা বাধে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দের লোভে আমার এখনও গরীব হয়েই থাকতে ইচ্ছে করে।

কৈশোরে বৃষ্টি মানেই ভিজতে ভিজতে স্কুলে যাওয়া, ফুটবল নিয়ে মাঠে গড়াগড়ি, ভেজা কাপড়ের শরীরেই শুকিয়ে যাওয়া। মা’র চোখ রাঙানো কিংবা হ্যাচ্চো-হ্যাচ্চোর বিরক্তিও আমাদের থামিয়ে রাখতে পারেনি। মনে পড়ে, এমনই এক বর্ষায় ঝুম বৃষ্টিতে আমরা ক’জন স্কুল ছেড়ে বড়মাঠের কাদায় জীবনপণ হুটোপুটি খেলছি। সদ্য বানানো স্কুল ড্রেস বিক্ষিপ্ত ছিড়ে পড়েছে। সেদিকে খেয়ালই নেই। ভেজা শরীরে বাসায় ফেরার পর নাপার সাথে মা’র বেদম মার।

তারও পরে প্রথম একতরফা প্রেম। বৃষ্টিদিনে কাঁথা মুড়ি দিয়ে স্বপ্নের ঢেউ। প্রেমিকার নামটাও বৃষ্টি। আবার কোন বর্ষাদিনে অন্য কোন কিশোরের সাথে তার হাসিমুখ দেখে বৃষ্টির পানিতে কান্না ধুয়ে যাওয়া।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মা’র বাধা নেই। বৃষ্টিতে উদ্দাম ভিজছি। কখনও বন্ধুদের সাথে। কখনও বা সাথে প্রেমিকা। কখনও তুমুল বৃষ্টিতে আমি রাজপথে হাঁটছি একমনে।

প্রেমিকার সাথে রিকশায় প্রথম বৃষ্টি। কারও মুখে কোন কথা নেই। বৃষ্টির তোড়ে চোখ খোলা রাখার অদম্য চেষ্টায় সে ব্যস্ত। আর আমি একমনে চেয়ে তার দিকে। তার নতুন কেনা লাল ওড়নার রং সিঁদুরের মত গড়িয়ে পড়েছে কপাল বেয়ে। বাসায় ফিরে নিজের শরীরের পরতে পরতেও লাল রং।

**২**

গত ক’দিন ধরেই আমার স্বপ্নে মৃত মানুষদের ভিড়। নানুভাই আর বড়খালা ডাকছেন প্রাতঃভ্রমণ এর জন্য। আড়মোড়া ভেঙ্গে আলসে ভঙ্গিতে জুতো পায়ে গলাতেই তাদের আবছা মুখগুলো হারিয়ে যায়। ঘুম ভাঙ্গা শরীরটা বেশ কিছুক্ষণ মশগুল হয়ে থাকে প্রিয় মুখগুলোর স্মৃতির খোঁজে।

নানুভাই বেড়াতে এলেই আমরা সকালে হাঁটতে বেরুতাম আমার কাঞ্চন(পূণর্ভবা) নদীর ধারে। নিয়মকরে প্রতি ভোরে নামাজের পর নানুর সঙ্গী টু ব্যান্ডের রেডিও। বিবিসি, রেডিও তেহরান হয়ে কখনও সখনও বাংলাদেশ বেতার। মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে চোখে লেগে থাকা ঘুম তাড়িয়ে বলতেন -উঠে পড়ো ভাইজান, সকাল হয়েছে।

এই মানুষটির মৃত্যু সংবাদ আমায় কাঁদায়নি। বরং অন্যের কান্নায় ভেঙ্গে পড়া মুখগুলো দেখতে হবে বলে আমি গুমড়ে পড়ে থাকি ঢাকায়।

নানুর মৃত্যুর কয়েকমাস বাদে বড় খালার বেলায় আর পালাতে পারিনি। মৃতবাড়ির গুমোট বাতাসে দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। লাশের কাছে যাবার ভান করে পায়ে পায়ে একসময় পালিয়ে আসি সবার অলক্ষ্যে।

শুক্রবার এলেই খালার ফোন-‘আজ দুপুরে এখানে খাবি, চলে আয়।’ আমি অম্লানবদনে মিথ্যে বলে স্বভাবসুলভ ভাবে এড়িয়ে যেতাম। আর কোনদিন খালার ফোন আসবেনা ভেবে সেদিনও আমার কান্না পায়নি।

আমার চোখে সেদিনও পানি আসেনি যখন পত্রিকার পাতায় ৯ জন শান্তিরক্ষীর ছবি দেখে বাবা আঁতকে উঠেছিলেন। মা’র শরীরের কাঁপুনি দেখে বুঝলাম ভয়ঙ্কর কিছুর আভাস। কঙ্গোতে নিহত সেই ৯ জনের একজন ছিলেন আমার মামা। প্রেষণে দিনাজপুর বিডিআর এ পোস্টেড ছিলেন দুবছর। বছর ঘুরতেই মিশনের ডাক। যাবার আগে বলে গেলেন ফিরলেই বিয়ে করবেন।

ক্যাপ্টেন সাহেবের বিশাল শরীরটা নাকি গুলিতে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আমার চোখে পানির বদলে তার ঘর কাঁপানো হাসির দমক।

বড় ফুপি প্রায়ই আমাকে দেখতে চাইতেন। এবছর বাবা-মা জোর করে নিয়ে গেলেন আমায়। কঙ্কালসার বুড়ো মহিলার স্মৃতিবিভ্রম নৈমত্তিক হলেও আমার নাম বলে যে জয়ীর হাসি দিলেন তার রেশ লেগে আছে আমার চোখে। চোখের জল সেটা ছুঁয়ে দিতে পারেনি।

বুকের কাছের মৃত মানুষ বলতে এঁরাই। প্রতিদিন গোটাকয়েক মৃতের সংবাদে চোখ বুলিয়ে আমাকে তার ক্রম তালিকা করতে হয়। গুরূত্ব বিচারে কোনটি পাঠকের দৃষ্টির সীমায় আর কোনটি চোখের কোণায়। গাড়ি চাপা কিংবা গলা কেটে খুন, আত্মহত্যা কিংবা সাধারণ মৃত্যু সব খবরেই আমি নির্বিকার।

শুধু বৃষ্টি এলেই সব ওলট-পালট হয়ে যায়। কান্নাটা কেন জানি আর চেপে রাখা যায়না। বৃষ্টির পানি আর চোখের জল দুটোই তখন মিশে একাকার।

 শামস সয়ুজ

লেখক ও সাংবাদিক

আমাদেরসময়ডটকম

Authors
  
Top