রাজনীতিতে পলিটি· ঢুকে গেছে

Dr-Qaiyum-Parvez

Dr-Qaiyum-Parvez

কাইউম পারভেজ

খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম যেন দেশ-বিদেশ কর্তৃপক্ষ আমাকে লেখার জন্য যোগাযোগ না করেন। অনেকটা লুকিয়ে থাকার মত। অবশেষে শেষ মুহুর্তে ধরা পড়ে গেলাম। জামশেদ নাসিরির ফোন – আপনার কলামের লেখা কোথায়? আমাদের তো হাতে আর সময় নেই। বললাম পাঠাচ্ছি। কিন্তু কিছুই লিখতে পারছিনা। আমার লুকিয়ে চুপিয়ে থাকার কারণটাও তাই। লিখবো কী? কলমতো চলে না। যা লিখতে চাই তাই মনে হয় নিরর্থক- আত্মপ্রবঞ্চনা, আত্মার কষ্ট। আমাদের দেশটায় মাসাধিককাল ধরে যা চলছে তাতে যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি। সবার মত আমিও কোন সমাধান দেখছি না। সমাধান নেই। কারণ?
কারণটা দেশের রাজনীতি এখন আর রাজনীতি নেই এর মধ্যে পলিটি· ঢুকে গেছে। যদিও বেশীর ভাগ মানুষ এই কথাটা জোক-কৌতুক হিসেবে ব্যবহার বিবেচনা করেন কিন্তু আমি তা করিনা। আমি মনে করি সত্যি সত্যিই দেশের রাজনীতিতে পলিটি· ঢুকে গেছে সেকারণে রাজনীতি আর রাজনীতি নেই এখন রাজনীতি মানে “তোরা যে যা বলিস ভাই আমার সোনার হরিণ চাই”। পুড়ে মরুক আরো একক দশক শতক সহ¯্র মানুষ কিস্সু যায় আসে না। সারা দেশ জ¦লে পুড়ে মরে ছারখার হোক নিরোর বাঁশী বাজতেই থাকবে। দেশ জুড়ে ককটেলের ফায়ার ওয়ার্কস্ চলুক প্রতি সেকেন্ডে আমার কিস্সু আসে যায় না। আমার কোন শোক নেই বিশ্রাম নেই বিবেক নেই কেবল আছে ক্ষমতার সোনার হরিণের ¯^প্ন।
আমাদের কালচারে এখন রাজনীতি আর পলিটি·ের অর্থ ভিন্ন। রাজনীতি অর্থ হলো এক ধরণের পেশা যা দিয়ে জীবিকাধারণ করা যায়, যা সুন্দর ¯^প্ন দেখায় এবং বিনা পুঁজিতে সে ¯^প্নের বাস্তবায়ন ঘটে যায় রাতারাতি। বাংলাতে পলিটি· শব্দটায় কেমন যেন একটা নোংরা নোংরা ভাব। কু অর্থে এর প্রয়োগ বেশী। যেমন ধরুন যাঁরা রাজনীতি করেন তাঁরা সব সময় বলবেন আমি রাজনীতি করি – বলবেন না আমি পলিটি· করি। আবার ধরুন পরিবারে সদস্যদের মধ্যে বিবাদ। ঝগড়াঝাটি চলছে তুমুল তার মধ্যে একজন বলবে – তুমি ছোট আপার (বা মিয়া ভাইয়ের) সাথে পলিটি· করে আমাদের সর্বনাশ করতে চাচ্ছো তাই না? বলবে না তুমি ছোট আপার(বা মিয়া ভাইয়ের) সাথে রাজনীতি করে আমাদের সর্বনাশ করতে চাচ্ছো তাই না? খারাপ কোন কিছু হলেই মানুষ বলে আমি ভাই এসব পলিটি·ের মধ্যে নেই – বলে না কিন্ত আমি ভাই এসব রাজনীতির মধ্যে নেই। তাহলে ব্যপারটা কী দাঁড়ালো? রাজনীতি ভাল জিনিষ আর পলিটি· খারাপ জিনিষ তাই না? অতএব রাজনীতির মধ্যে যখন পলিটি· ঢুকে যায় তখন তা ভয়ঙ্কর রূপ নেয় যা চলছে এখন বাংলাদেশে।
যতই বলুক ১৪ দলীয় আর ২০ দলীয় জোট – দল আসলে এখন দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনার দল এবং খালেদা জিয়ার দল। অন্যভাবে বলা যায় মুক্তিযুদ্ধ ও ¯^াধীনতার পক্ষ বিপক্ষের দল। এখন আর কোন আলোচনা বৈঠকের অবকাশ নেই। উভয়েরই অস্তিত্বের প্রশ্ন। একাত্তরে যেমন একই ইস্যুতে অস্তিত্বের লড়াই হয়েছে এখনো বুঝিবা সেই সময় এসে গেছে। বন্দী হবার আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম তারেক জিয়ার লন্ডনে বঙ্গবন্ধুকে কটাক্ষ করে প্রদত্ত ভাষণের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন ইটকেলটি দিলে পাটকেলটি খেতে হয়। এখন তাই চলছে। ইটকেল আর পাটকেল। পেট্রোল বোমা, ককটেল, গুলি জবাই আর র‌্যাব পুলিশ বিজিবি। সমানে চলছে ইটকেল পাটকেল।
কিন্তু এর মূল্য কেন দেবে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ? উভয় দলের ক’জন নেতার গায়ে পেট্রোল বোমার আগুন লেগেছে? ক’জন নেতানেত্রীর ছেলেমেয়েদের গায়ে আগুন ককটেল লেগেছে? ক’জন নেতানেত্রী ¯^ামীহারা , পিতামাতা হারা হয়েছেন? তবে কেন বরিশালের সোহাগ বিশ^াসের মত ১৮/১৯ বছরের এক কিশোর বাসের মধ্যেই পুড়ে অঙ্গার হয়ে শুয়ে রইলো যে ছবি আমরা ফেসবুক পত্র-পত্রিকায় দেখে আঁতকে উঠেছি। সোহাগ বিশ^াসের বাবা নেই মা অন্ধ। দুবেলা আহারের ব্যবস্থা ছিলো না। অনেক চেষ্টা করে বাসের হেল্পারের একটা চাকরী নিয়েছিলো। সেদিন সোহাগের প্রথম চাকরীতে যাওয়া। হরতালের কারণে কখন বাস চলবে নিশ্চিত নয় বলেই বাসে ঘুমিয়ে ছিলো। তারপরের ঘটনা সবার জানা। থেমে থাকা বাসে পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে দেয়া হলো। বাস পুড়লো। সোহাগ পুড়লো। অন্ধ মায়ের সর্ব¯^ পুড়লো। আমরা ছবিতে দেখলাম সোহাগ পোড়া সিটের উপর তেমনি শুয়ে আছে। ঝলসানো মাংস ভেদ করে পোড়া হাড়গুলো কেবল উঁকি দিচ্ছে। ভেবে দেখুন জ¦লন্ত সিগারেটের একটু আগুণের ছাইচাপা ফুলকী হাতে উড়ে এসে পড়লে তার ফোসকা থাকে ২/৩ দিন। এবং এর প্রদাহটা কত কষ্টের। তেমনি রান্নার সময় একটু গরম তেল ছিঁটে এসে লাগলে কী জ¦লুণী তা ভূক্তভোগীরা জানেন। আর সোহাগ যেমনি শোয়া অবস্থায় ছিলো তেমনি অঙ্গার হয়ে পুড়ে পড়ে রইলো।
এক সোহাগ নয়। এভাবে এযাবত শিশু কিশোর কিশোরী যুবা বৃদ্ধ বৃদ্ধাসহ ৪২ জন পুড়ে মরেছে (এ লেখা বেরুতে বেরুতে এই সংখ্যা আরো কত বাড়বে কে জানে) শতকের উপরে হতভাগ্য মানুষ দগ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছে। এরা কেউ রাজনীতি করে না পলিটি· ও করে না। জীবিকার তাগিদে এরা কেউ বাসট্রাকের ড্রাইভার হেল্পার নয় তো যাত্রী। পৃথিবীর কোন স্থানে এমন গণতন্ত্রের আন্দোলন হয়েছে? জ্যান্ত মানুষ ধরে পুড়িয়ে মারছে? আর কোথাও নেই কারণ ওদের রাজনীতিতে পলিটি· ঢুকতে পারেনি।
রাজনীতিতে পলিটি· ঢোকার কিছু সাম্প্রতিক নমুনা কেবল উদহারণ হিসেবে তুলে দিলাম:
১.গাজীপুরে বিশ দলীয় জোটের সমাবেশটি ১৪৪ ধারা জারি করে বন্ধ করার কোন যুক্তি সঙ্গত প্রয়োজন ছিলো কী? এর আগেও ঢাকার বাইরে তারা কয়েকটি সমাবেশ করেছে অনুমতি নিয়ে। যদি গাজীপুরের সমাবেশে ধ্বংসাত্বক কর্মকান্ডের সম্ভাবনা সরকার দেখে থাকে তবে সরকারের আইন শৃক্সখলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে কী তা গুঁড়িয়ে দেয়া যেতো না? শাপলা চত্বরে কী গুঁড়িয়ে দেয়া যায়নি?
২.যদি গাজীপুরে সমাবেশ হতো আর সেখানে যদি বিএনপি জোট কোন ধ্বংসাত্বক কর্মকান্ড ঘটাতো তবে সেই কারণ দেখিয়ে ঢাকার সমাবেশ অনায়াসে বন্ধ করে দেয়া যেতো। সেক্ষেত্রে বালুর ট্রাক থিরাপীর প্রয়োজন হতো না। ৩.জঙ্গী-শিবির সন্ত্রাসী সহযোগে সরকার অচল করে দেয়ার বিশাল পরিকল্পনা যখন দলীয় লোকেরাই ফাঁস করে দিলো তখন সরকার তো বসে থাকতে পারে ন্।া পরিকল্পপনা মাফিক মির্জা ফখরুল গিয়ে বসে থাকলেন প্রেস ক্লাবে কিন্তু তাঁদের নেত্রীকে বেরুতে দেয়া হলো না। এই অবরুদ্ধতা পুঁজি করে বিএনপি নেত্রী ¯^ীয় দপ্তরে অবস্থান নিলেন। আর বাড়ী মুখো হলেন না গেট খুলে দেবার পরেও।
৪.তাঁরা কোন আন্দোলন দাঁড় করাতে পারলেন না। আন্দোলন বলতে শিবিরের কর্মীদের দ্বারা এবং টোকাই ভাড়া করে বাসে গাড়ীতে পেট্রোল বোমা মারা (রেট একশো থেকে পাঁচশো টাকা, লোক মারতে পারলে সেটা হাজার হয়ে যায়)। যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁদের গণতন্ত্র ফিরেনা আসবে পেট্রোল বোমা চলতেই থাকবে। এবং বিএনপি বলছে এইসব আগুন বোমা সব সরকারের সন্ত্রাসী বাহিনীর কাজ। আর সরকার বলছে চোখের সামনে দেখছে/ধরছে শিবির টোকাই আর বিএনপি কর্মীর হাতে বোমা।
৫.এমন কী সাবেক মন্ত্রী রিয়াজ উদ্দীনকেও গাড়ী থেকে বের করে গুলি করে বহিঃর্বিশে^র নজর কাড়ানোর জন্য চেষ্টা চললো। কেউ কোনদিন শুনেছেন সন্ত্রাসীরা তাদের টার্গেট হাতে পেয়ে পায়ে হালকা গুলি করে চলে গেছে প্রাণে না মেরে?
৬.কোকো মারা গেলো। প্রধানমন্ত্রী সব ভুলে নয়তো ঋণ শোধ করতে ছুটে গেলেন গুলশান কার্যালয়ে। তাঁকে ঢুকতে দেয়া হলো না। কেউ গেটে এসে সামান্য ভদ্রতা টুকুও দেখায়নি যদিও ভেতরে হ্যাভিওয়েট কয়েকজন নেতা উপস্থিত। প্রধানমন্ত্রীর ¯^ামীর মৃত্যুর পর বেগম জিয়া গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীকে শোক জানাতে। এমন একটি সংকটময় মুহুর্তে প্রধানমন্ত্রী গেলেন খালেদা জিয়ার কাছে যেখানে দু’জনার আলাপ করার বা আলাপের দ্বার উন্মোচন করার সমূহ সম্ভাবনা হয়তো ছিলো তা হলো না। বরং সারা বিশ^ দেখলো কীভাবে প্রধানমন্ত্রী অপমানিত হয়ে ফিরে এলেন।
৭.সেনা নীতিমালানুসারে সেনা পরিবারের সদস্যরা নির্ধারিত কবরস্থানে সমাহিত হবার অধিকার রাখে অথচ কোকোকে সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলো। এর কী কোন প্রয়োজন ছিলো? কোকোর জানাজায় লাখের উপর মানুষের অংশগ্রহণ কী রাজনীতি এবং পলিটি·ের হিসাব ওলোট পালট করে দেয়নি?
৮.বেগম জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ একবার কেটে দেয়া হলো আবার ১৮ ঘন্টা পর তা জুড়ে দেয়া হলো।
রাজনীতিতে কী পলিটি· ঢুকছে না? রাজনীতি কী কলূষিত হচ্ছে না। এটা হচ্ছে তা সবাই জানে সবাই বোঝে। তবু করবে কারণ তোর যে যা বলিসভাই আমার সোনার হরিণ চাই।
ফলে নষ্ট রাজনীতি নষ্টই থাক এটা আর শুধরানোর কোন অবকাশ বা সুযোগ নেই। হবে বলেও মনে হয় না যতই পত্রপত্রিকায় লেখালেখি আর টিভির পর্দায় টক শো হোক। রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে এবং রাষ্ট্রের মানুষের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্বও প্রধানমন্ত্রীর। মাসব্যাপি হত্যাযজ্ঞের অবসান হলো না পুলিশ র‌্যাব বিজিবি দিয়েও। আর এমন বিভৎস মানব-রোস্ট দেখতে চাই না। অবিলম্বে এই সন্ত্রাসী সর্বনাশী কর্মকান্ড বন্ধ করার প্রয়োজনে দেশে জরুরী অবস্থা বা তেমন কোন বিকল্প ব্যবস্থায় এই আগুন সন্ত্রাসীদের হাত থেকে আবালবৃদ্ধবনিতাকে শান্তিতে নির্ভয়ে রুটীরুজি আয়ের পথ নিরাপদ করা হোক। দেশ যেমন সার্বিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলো এবং মানুষকে একটু ¯^স্তি দিতে পারছিলো তেমন অবস্থায় দেশ পুনরায় ফিরে আসুক। অর্থনীতির চরম সর্বনাশের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রীকেই এগিয়ে আসতে হবে। যত কঠিন হওয়া প্রয়োজন হতে হবে দেশ এবং দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে।
যে রাজনীতি পলিটি·ে জড়িয়ে পেট্রোলবোমায় রূপ নিয়ে মানব-রোস্টে পরিতৃপ্ত ধিক সে রাজনীতি ধিক সে পলিটি·।

Authors
Top