রোজা ও ঈদে চাঁদ দেখার বিতর্কের অবসান চাই।

moon of eid

মানবসভ্যতার আদিলগ্ন থেকেই মানুষ চাঁদের উপর ভিত্তি করে মাস গণনা করে আসছে। চাঁদ পৃথিবীর একটি উপগ্রহ মাত্র এবং একমাত্র উপগ্রহও বটে। গ্রহ হিসেবে পৃথিবী যেমন তার নক্ষত্র সূর্যের চারিদিকে আবর্তন করে এবং পূর্ণ একটি আবর্তনের মেয়াদকে আমরা সৌরবৎসর হিসেবে গণনা করি; একইভাবে চাঁদও তার আবর্তনকেন্দ্র পৃথিবীর চারিদিকে পরিভ্রমণ করে এবং পূর্ণ একটি আবর্তনের মেয়াদকে চান্দ্রমাস হিসেবে গণনা করা হয়।

চাঁদের আবর্তনের সাথে সাথে তার আকার- আকৃতি দৃশ্যত পরিবর্তিত হতে থাকে। আসলে চাঁদের কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন ঘটে না। সূর্যের আলোকে আলোকিত চাঁদের অর্ধাংশের পুরোটা শুধু পূর্ণিমালগ্নেই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। পূর্ণিমার পরে চাঁদের আলোকিত অর্ধাংশ ক্রমশ আমাদের দৃষ্টির আড়ালে যেতে থাকে এবংঅনালোকিত অর্ধাংশ ক্রমশ আমাদের সম্মুখে আসতে থাকে-যে অংশটুকু আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না।পূর্ণিমার প্রায় পনেরোদিন পর চাঁদের আলোকিত অর্ধাংশ পুরোপুরিভাবে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। ওই সময়টাতে চাঁদটি সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে অবস্থান করে, ফলে চাঁদের সূর্যবরাবর অর্ধাংশ আলোকিত থাকে এবং বিপরীত দিকের অনালোকিত অর্ধাংশ পৃথিবীর মুখোমুখি থাকে এবং আমরা এই লগ্নকে অমাবস্যা বলি। অমাবস্যার পর আবারো চাঁদের আলোকিত অর্ধাংশ ক্রমশ আমাদের দৃষ্টিগোচরে আসতে থাকে এবং পূর্ণিমার সময় তা পূর্ণতা পায়। বিষয়টি পুরোপুরি পৃথিবী ও সূর্য সাপেক্ষ চাঁদের কৌণিক অবস্থানের উপর নির্ভরশীল।

এতক্ষণ চাঁদের পরিক্রমণ নিয়ে আমাদের আলোচনা হলো। এবার আসা যাক মূল প্রসঙ্গে। চান্দ্রমাসকে বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাস বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করে থাকে। ইসলাম ধর্মেও চান্দ্রমাসগুলোর মাহাত্ম্য তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। রোজা, ঈদ, হজ্ব, আশুরা, সিরাতুন্নবী ইত্যাকার পর্বাদিতে চান্দ্রমাসের তারিখগুলোই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চান্দ্রমাসের তারিখ নিয়ে মতভিন্নতার ফলে পৃথিবীতে ভিন্ন ভিন্ন দিনে রোজা শুরু হয় ও ঈদ উদযাপিত হয়। কখনো এই পার্থক্য তিনদিনে গড়ায়। কারণ হিসেবে বলা হয় যে- চাঁদ দেখা যায় নাই ইত্যাদি। প্রশ্ন হলো- চাঁদ দেখাটা অত্যাবশ্যকীয় কি না। মধ্যযুগে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত ছিল না, ফলে আফ্রিকার মানুষে চাঁদ দেখলে এশিয়ার মানুষের তা জানার উপায় ছিল না। তাই চাঁদ না দেখা পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যেতো না। আজ-কাল তো আর সেই সমস্যা নেই। তবুও কেন এই ভিন্নতা? কেন চাঁদ দেখা না দেখার বিতর্ক এত প্রকট?

অমাবস্যা, পূর্ণিমা, চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ ইত্যাকার ঘটনাবলি দীর্ঘ সময়ব্যাপী সংঘটিত হয় না, মিনিট কয়েকের মধ্যেই সম্পন্ন হয়। পূর্ণিমা এবং চন্দ্রগ্রহণ যুগপৎ, যদিও সকল পূর্ণিমায় চন্দ্রগ্রহণ হয় না- বছরে দু-চারটি হয়ে থাকে মাত্র। পূর্ণিমা ও চন্দ্রগ্রহণলগ্নে চাঁদের অবস্থান যদি ভারতের আকাশে থাকে, তা হলে কানাডাবাসী সেই চন্দ্রগ্রহণ প্রত্যক্ষ করতে পারে না। তাই বলে কানাডাবাসীর কাছে দৃশ্যমান হওয়ার জন্য কানাডার আকাশে আরেকদফা পূর্ণিমা ও চন্দ্রগ্রহণ সংঘটিত হয় না। ভারতের আকাশের পূর্ণিমা বা চন্দ্রগ্রহণের লগ্নটি শুধু ভারতে নয়, সমগ্র পৃথিবীর ক্ষেত্রেই কার্যকর। একইভাবে অমাবস্যার লগ্নও যদি বিশ্বব্যাপী একই হয়, তবে অমাবস্যার পরপরই নতুন চাঁদের জন্মলগ্নও বিশ্বব্যাপী একই হওয়া উচিত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আজ-কাল এতদূর এগিয়েছে যে, আগামী কয়েক শতাব্দীর কোন কোন লগ্নে অমাবস্যা, পূর্ণিমা, সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ ইত্যাদি সংঘটিত হবে তা নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। অমাবস্যার দিন-ক্ষণ যদি এভাবে নির্দিষ্ট হয়েই থাকে, তবে নতুন চাঁদের অভ্যুদয়ক্ষণও নির্দিষ্ট করা আছে বলা যায়। তা হলে চান্দ্রমাসের তারিখ নিয়ে আমাদের এত ভিন্নতা ও বিভ্রান্তি কেন? বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধাগুলো কাজে না লাগিয়ে আমরা কেন চাঁদের তারিখ নিয়ে জটিলতা পাকাচ্ছি?

অমাবস্যার লগ্নটি যেহেতু তথ্যপ্রযুক্তির ভাণ্ডারে সংরক্ষিত রয়েছে, সেই লগ্নটি অতিক্রান্ত হওয়ার পরমুহূর্তেই নতুন চাঁদের শুভযাত্রা গণ্য করা যায় এবং রোজা কিংবা ঈদ, যেটাই হোক, পরবর্তী ভোরেই কার্যকর করা যায়। ভৌগলিক অবস্থানের পার্থক্যের জন্য সর্বোচ্চ চব্বিশঘণ্টার ব্যবধান হতে পারে, এর বেশী নয়।

ধরা যাক- যে লগ্নে অমাবস্যা অতিক্রান্ত হয়েছে, সেই লগ্নে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনের পূর্বদিগন্তে সূর্যের আলোকচ্ছটা দৃশ্যমান নয়, কিন্ত নিউজিল্যাণ্ডের পূর্বদিগন্তে আলোকচ্ছটা দৃশ্যমান। এমতাবস্থায় অস্ট্রেলিয়ায় আসন্ন ভোরেই রোজা বা ঈদ কার্যকর হবে, কিন্তু নিউজিল্যাণ্ডে কার্যকর হবে এর পরবর্তী ভোরে তথা অস্ট্রেলিয়ার বাইশ ঘণ্টা পর। তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে সেটা আগে থেকেই সুনির্ধারিত করে রাখা সম্ভব। এখন প্রয়োজন একটি বিজ্ঞানমনস্ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনের- যেখানে সিদ্ধান্তটি গৃহীত হবে।

প্রবন্ধকার: নূরুল ইসলাম, সিডনী, অস্ট্রেলিয়া। Cell: 0470 550 651, E-mail:- islamifsf@yahoo.com

Authors
Top