রোহিঙ্গা শিবিরে ভাতের হাহাকার। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে সোয়া লাখ শরণার্থীর আশ্রয়, মানবেতর জীবনযাপন

rohinga 9

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের মুখে গণহত্যা থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে প্রায় এক লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৫ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। খাদ্য, পানি, বাসস্থান ও চিকিৎসার অভাবে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মার্কিন মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে ভাতের হাহাকার চলছে। তাই দ্রুত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে।

এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের জন্য জরুরি ত্রাণ সহায়তার কথা বলেছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। মঙ্গলবার সংস্থার এক বিবৃতিতে মিয়ানমারে অব্যাহত সহিংসতা এবং এর ফলে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত মাসে মিয়ানমারে উত্তরের রাখাইন রাজ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত বাংলাদেশে আনুমানিক ১ লাখ ২৩ হাজার শরণার্থী প্রবেশ করেছে। মিয়ানমারে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। নতুন সৃষ্টি হওয়া এ সংঘাতের মূল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি, যাতে করে মানুষ আর পালিয়ে আসতে বাধ্য না হয়। সেই সঙ্গে এই ব্যবস্থাও করা উচিত যাতে তারা নিরাপদে এবং সম্মানের সঙ্গে তাদের বাসস্থানে ফিরতে পারে।
ইউএনএইচসিআরের বিবৃতিতে বলা হয়, �যে সব মানুষ বাংলাদেশে এসেছে তাদের অবস্থা করুণ। অনেকেই তাদের গ্রামের বাড়ি থেকে জঙ্গল, পাহাড়, নদী অতিক্রম করে এসেছে। তারা ক্ষুধার্ত, দুর্বল ও অসুস্থ।�

গত ২৫ আগস্ট ভোররাত থেকে রাখাইনে সীমান্তরক্ষী পুলিশের সঙ্গে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সদস্যদের সংঘাত শুরু হয়। এতে শতাধিক ব্যক্তি নিহত হন। এর মধ্যে ১২ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বাকিরা আনসার সদস্য।
এ ঘটনার পর মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী বিতাড়ন অভিযান শুরু করে। তারা রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলোতে হানা দিয়ে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করছে এবং ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করছে। অভিযানকালে গত ১১ দিনে অন্তত ৪০০ রোহিঙ্গা নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই সাধারণ নিরস্ত্র রোহিঙ্গা।
এদিকে অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী ও শিশু। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা অভিযোগ করেছেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী এবং বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের হত্যা করছে, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডবিস্নউ) বলেছে, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলো জ্বালিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। স্যাটেলাইট থেকে সংগৃহীত ছবির সূত্রে এইচআরডবিস্নউ ১৭টি পৃথক স্থান চিহ্নিত করেছে যেখানে কোথাও কোথাও পুরো গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। শুধু রাখাইন রাজ্যের মুসলিম অধ্যুষিত রাতিডং এলাকাতেই ৭০০ বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
এদিকে রাখাইন প্রদেশে সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আরাকান প্রজেক্টের পরিচালক ক্রিস লেওয়া বলেছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর পাশাপাশি দেশটির কিছু সাধারণ মানুষও গণহত্যায় অংশ নিচ্ছে।
নৃশংসতার প্রমাণ লুকাতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী মরদেহ সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এদিকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান চলবে বলে আভাস দিয়েছেন মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং লাইং।
পাহাড়ে ৩০ হাজার রোহিঙ্গা : এদিকে সেনাবাহিনীর চরম নির্যাতন-হামলা আর ধর্ষণের মুখে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম কোথাও জায়গা না পেয়ে মিয়ানমারের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে আটকা পড়েছেন।
মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। রেবেকা রাইট ও ব্যান ওয়েস্টকটের তৈরি করা এই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মূলত নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বাধায় তারা প্রবেশ করতে না পেরে ফিরে যায়। আবার তারা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ভয়ে নিজেদের গ্রামে বা বাড়িতে ফিরতে পারছে না। তাদেরই একটি অংশ রাখাইন রাজ্যের মংডু ও রাথেডং শহরের কাছাকাছি পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান নিয়েছে।
বার্মা হিউম্যান রাইট নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক কিউ উইন বলেন, ‘এখানে যারা আটকে আছে, তারা ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে রয়েছে। মানবিক কারণেই যত দ্রুত সম্ভব তাদের উদ্ধার করা উচিত।’
প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের স্যাটেলাইটে তোলা একটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, এই ছবিটি গত ৩১ আগস্ট রাখাইন রাজ্যের চেন খাঁর লি গ্রাম থেকে তোলা। গ্রামটি মুসলিম অধ্যুষিত।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া চ্যাপ্টারের উপপরিচালক ফিল রবার্টসন সিএনএনকে বলেন, ‘এই ছবি থেকে মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামটির ধ্বংসের আকার বোঝা যাচ্ছে। ছবিটি এই গ্রামটির একটি অংশের মাত্র। আমরা যা আশঙ্কা করছি, প্রকৃত অবস্থা তার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ।’ ওই গ্রামের ৯৯ ভাগ বাড়িই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সংখ্যায় এটি ৭০০ বেশি হবে।
মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতার শিকার হয়ে ২৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত সর্বশেষ সোয়া লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোরভাবে তৎপর রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। প্রতিদিনই নৌকায় বা সীমান্ত পথে আসা রোহিঙ্গা আটক করে পরে তাদের ফের নিজ দেশে পাঠাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করার সময় নৌকা ডুবে এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা মারা গেছেন।
যারা জীবন বাঁচিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, তাদের অবস্থাও করুণ। অনেককে শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় পেলেও খাবারের তীব্র সংকটের মধ্যে রয়েছেন। অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। অনেক রোহিঙ্গা পরিবার মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে উপকূলের পাশে বন-জঙ্গল সাফ করে বাঁশ-প্লাস্টিক দিয়ে ছাউনি তৈরির চেষ্টা করছেন।
গত ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইন রাজ্যে একসঙ্গে ২৪টি পুলিশ ক্যাম্প ও একটি সেনা আবাসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। ‘বিদ্রোহী রোহিঙ্গাদের’ সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ) এই হামলার দায় স্বীকার করে। এ ঘটনার পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী নিরস্ত্র রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুদের ওপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। সেখান থেকে পালিয়ে আসার রোহিঙ্গাদের দাবি, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নির্বাচারে গ্রামের পর গ্রামে হামলা নির্যাতন চালাচ্ছে। নারীদের ধর্ষণ করছে। গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
মিয়ানমার সরকারের বরাত দিয়ে জাতিসংঘ গত ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, মিয়ানমারে সহিংসতা শুরুর পর গত এক সপ্তাহে ৪০০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৭০ জন ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী’, ১৩ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, দুজন সরকারি কর্মকর্তা এবং ১৪ জন সাধারণ নাগরিক।
মিয়ানমার সরকারের আরও দাবি, ‘বিদ্রোহী সন্ত্রাসীরা’ এখন পর্যন্ত রাখাইনের প্রায় দুই হাজার ছয়শ বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। তাদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য এখনো রাখাইন রাজ্যে থাকা মুসলিমদের মধ্যে মাইকে প্রচার চালাচ্ছে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বালুখালিতে আশ্রয় পাবে
নতুন আসা রোহিঙ্গারা
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, মিয়ানমারে দমন-পীড়নের মুখে যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন, কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালিতে বন বিভাগের ৫০ একর জমিতে তাদের থাকার ব্যবস্থা করছে জেলা প্রশাসন।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খালেদ মাহমুদ মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, গত বছর অক্টোবরে রাখাইনে সহিংসতার পর রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ শুরু হলে উখিয়ার বালুখালিতে বন বিভাগের ওই জমি বরাদ্দ দেয়া হয় মাস ছয়েক আগে। গত বছর আসা কয়েক হাজার রোহিঙ্গা সেখানে আছে। নতুন করে যারা আসছে, তাদেরও সেখানে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হবে।
খালেদ মাহমুদ বলেন, নতুন আসা রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে না থেকে ওই ক্যাম্পের আশপাশে থাকতে বলা হয়েছে। সেখানে থাকলে কাউকে বাধা দেয়া হবে না। অন্য কোথায়ও থাকলে তাদের উচ্ছেদ করা হবে।
গত কয়েক দিন ধরে উখিয়ার কুতুপালং থেকে শুরু করে থাইংখালী পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাহাড়ে পাহাড়ে বাঁশ আর পলিথিনের অসংখ্য ঝুপড়ি গড়ে তুলেছে তারা। রোহিঙ্গাদের নতুন বসতি দেখা গেছে টেকনাফ সীমান্তবর্তী হোয়াইক্যং ইউনিয়নসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকাতেও।
আড়াই হাজার রোহিঙ্গাকে
ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার কারণে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার নাফ নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় আড়াই হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি।
বিজিবির টেকনাফ-২ ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর সাইফুল ইসলাম জমাদ্দার জানান, মঙ্গলবার ভোররাত থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নাফ নদীর কাঞ্জরপাড়া, ঝিমংখালী, উলুবনিয়া, খারাংখালী ও লম্বাবিল পয়েন্ট দিয়ে তাদের ফেরত পাঠানো হয়।
অনুপ্রবেশের চেষ্টাকারীরা অধিকাংশই নারী ও শিশু।
সাইফুল বলেন, পালিয়ে সীমান্তের মিয়ানমার অভ্যন্তরে শূন্যরেখায় অবস্থান করা রোহিঙ্গারা নাফ নদীর এসব পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। এ সময় বিজিবির টহলদলের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে দুই হাজার ৬৭৮ জন রেহিঙ্গাকে মিয়ানমার অভ্যন্তরে ফেরত পাঠায়।
অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবির সদস্যরা সীমান্তে কড়া অবস্থানে রয়েছে। এখনো বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শূন্যরেখার ওপাড়ে অবস্থান নিয়েছে বলে জানান সাইফুল।
গুলিবিদ্ধ আরও দুই রোহিঙ্গা
চট্টগ্রাম মেডিকেলে
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সেনা অভিযানের মধ্যে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বাংলাদেশে পালিয়ে আসা আরও দুই রোহিঙ্গা যুবক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
মঙ্গলবার সকালে তাদের চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয় বলে মেডিকেল পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই আলাউদ্দিন তালুকদার জানান।
আহতরা হলেন আমান উল্লাহ (২৮) ও মো. আরাফাত (২৫)। তারা দুজনই মিয়ানমারের আকিয়াবের বাসিন্দা।
এএসআই আলাউদ্দিন জানান, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে মেডিসিন সঁ্য ফ্রঁতিয়ে (এমএসএফ) হাসপাতালে আসার পর তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে পাঠানো হয়।

Authors
  
Top