রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে শেখ হাসিনার ৬ প্রস্তাব। জনগণের মন জয় করেই নির্বাচনে জিততে হবে সংবর্ধনা সভায় প্রধানমন্ত্রী

hasina 13

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে নির্যাতন বন্ধ করে তাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়া এবং তাদের জাতীয়তা নিয়ে রাষ্ট্রীয় অপপ্রচার বন্ধ করাসহ ছয়টি পদক্ষেপ নেয়ার প্রস্তাব মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের সামনে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এ ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবিলায় ওআইসিভুক্ত দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও আহবান জানিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ওআইসি কনট্যাক্ট গ্রুপের বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা এই ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযানের অবসান দেখতে চাই। আমাদের মুসলমান ভাইদের এই দুর্দশার অবসান চাই। এই সংকটের সূচনা হয়েছে মিয়ানমারে এবং সেখানেই এর সমাধান হতে হবে।’ শেখ হাসিনার

ছয় দফা প্রস্তাব হলো:
এক. রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সব ধরনের নিপীড়ন এই মুহূর্তে বন্ধ করতে হবে।
দুই. নিরপরাধ বেসামরিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য মিয়ানমারের ভেতরে নিরাপদ এলাকা (সেইফ জোন) তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে তাদের সুরক্ষা দেয়া হবে।
তিন. বলপ্রয়োগের ফলে বাস্তুচ্যুত সব রোহিঙ্গা যেন নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে মিয়ানমারে তাদের বাড়িতে ফিরতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
চার. রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে কফি আনান কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ অবিলম্বে নিঃশর্তভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
ঈাঁচ. রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করার যে রাষ্ট্রীয় প্রপাগান্ডা মিয়ানমার চালাচ্ছে, তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।
ছয়. রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে না ফেরা পর্যন্ত তাদের জরুরি মানবিক সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে হবে ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশগুলোকে।
বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৪ আগস্ট রাতে আড়াই ডজন পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে হামলার পর দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের গ্রামে গ্রামে নতুন করে দমন অভিযানে নামে।
সেনাবাহিনী কীভাবে গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ মারছে, ঘরের ভেতরে আটকে রেখে কীভাবে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, লুটপাট চালিয়ে কীভাবে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে, সেই বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কথায়।
ওআইসি কনট্যাক্ট গ্রুপের বৈঠকে বিভিন্ন মুসলিম দেশের নেতাদের উপস্থিতিতে বক্তৃতার শুরুতেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মিয়ানমারে আজ মুসলমান ভাই-বোনেরা জাতিগত নির্মূল অভিযানের মুখোমুখি হয়েছে। রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের চালানো সামরিক অভিযান বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে।’
এ ঘটনায় এবারই সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশান্তরী হতে বাধ্য হয়েছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, গত ২৫ আগস্ট থেকে চার লাখের বেশি মানুষ মিয়ানমার থেকে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এই শরণার্থীদের ৬০ শতাংশই শিশু।
‘এটা এক অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয়। আমি নিজে তাদের কাছে গেছি, তাদের মুখ থেকে, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ভয়াবহ দুর্ভোগের বিবরণ শুনেছি। আমি বলব, আপনারা সবাই আসুন, এই শরণার্থীদের মুখ থেকে শুনে যান, মিয়ানমারে কী রকম নির্মমতা চলছে।’
কয়েক যুগ ধরে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গার ভার বহন করে আসা বাংলাদেশের এই দফায় আরও প্রায় চার লাখ শরণার্থী প্রবেশ করেছে। রাখাইনের পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই সংখ্যা ১০ লাখে ঠেকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।
নির্যাতনের শিকার আরও চার লাখ রোহিঙ্গাকে গত তিন দশক ধরে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা আট লাখ ছাড়িয়েছে। ভূমি স্বল্পতা আর সম্পদের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলাদেশ তাদের আশ্রয়, খাবার আর জরুরি সহায়তা দিয়ে আসছে বলে বৈঠকে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা ‘বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী’ বলে দাবি করছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। অথচ ঐতিহাসিক নথিপত্র বলছে, রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যে বসবাস করে আসছে শত শত বছর ধরে।
মিয়ানমারের সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং তিন দিন আগেও তাদের সশস্ত্র বাহিনীর এক অনুষ্ঠানে দাবি করেন, রোহিঙ্গা বলে কোনো জাতিসত্তা মিয়ানমারে ‘কখনোই ছিল না’। যারা রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতির দাবি করছে, তারা ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’।
এ বিষয়ে মিয়ানমারের নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বক্তব্যে কান না দিতে আহবান জানান তিনি।
রাখাইনে এবারের সহিংসতা শুরুর পর মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে এসে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি বলেন, নব্বইয়ের দশকে করা প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় ‘যাচাইয়ের মাধ্যমে’ বাংলাদেশে থাকা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে তার দেশ প্রস্তুত।
কিন্তু এই শরণার্থীদের ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে স্বীকার করে না নেয়ায় এবং তাদের ওপর সেনাবাহিনীর নির্যাতনের বিষয়টি ভাষণে এড়িয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি সমালোচিত হচ্ছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘মিয়ানমার পরিকল্পিত ও সংগঠিত উপায়ে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বের করে দিচ্ছে। প্রথমত তারা নিবন্ধিত জাতিগোষ্ঠীর তালিকা থেকে রোহিঙ্গাদের বাদ দিয়েছে। তারপর ১৯৮২ সালের আইনে তাদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশেই আইডিপি ক্যাম্পে পাঠিয়েছে তারা।’
রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে গেলেও মিয়ানমার তাতে সাড়া দিচ্ছে না বলে মুসলিম দেশের নেতাদের জানান শেখ হাসিনা।
‘আপনারা হয়তো মিডিয়ায় দেখেছেন, রোহিঙ্গারা যাতে তাদের নিজের দেশে ফিরতে না পারে সেজন্য সীমান্তজুড়ে ভূমি মাইন পেতে রাখছে মিয়ানমার।’
রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবিলায় ওআইসির সদস্যভুক্ত দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহবান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এ বিষয়ে ওআইসির যেকোনো উদ্যোগে অংশ নিতে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে।

জনগণের প্রার্থী বাছাই
নিশ্চিত করতে চাই
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সামনেই নির্বাচন আসছে। আমাকে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে হলে জনগণের ভোট পেতে হবে। জনগণ যেন পছন্দের প্রার্থী বাছাই করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে চাই।’
যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দেয়া নাগরিক সংবর্ধনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে ম্যানহাটনের ম্যারিয়ট হোটেলে এই আয়োজন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি গণতন্ত্রের ভীত মজবুত করে দেশকে এগিয়ে নিতে চান। আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি তার ভাগনি যুক্তরাজ্যের এমপি টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিকের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘জনপ্রিয়তা কীভাবে বাড়াতে হবে, তা আমি আমার সংসদ সদস্যদের বলেছি। বড় গাড়ি, বাড়ি, টাকা দিয়ে ভোট পাওয়া যাবে না, জনগণের মন জয় করেই নির্বাচনে জিততে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ সভাসহ নিউইয়র্কে তার ব্যস্ততার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘প্রবাসীদের ভালোবাসা আর উচ্ছ্বাস দেখে সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে।’ তার প্রতি প্রবাসীদের ভালোবাসার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, জনগণের এ ভালোবাসাই তাকে প্রেরণা জোগায়।
দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে_উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। প্রতিটি খাতে দেশের উন্নয়নের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একসময় আমাদের যারা ক্ষুধা আর ভিক্ষুকের দেশ মনে করত, এখন তারা সম্মানের চোখে দেখে। বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেলে উন্নীত হয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান সংবর্ধনায় সভাপতিত্ব করেন। এতে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও তথ্যপ্রযুক্তি-বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।
সজীব ওয়াজেদ জয় তার বক্তব্যে বলেছেন, ‘প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা এখন বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয়। বাংলাদেশে এখন খাদ্যের অভাব নেই, বিদ্যুতের অভাব নেই। আমরা এখন পাশের দেশের নাগরিকদের সাহায্য করার কথা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি।’

নারীশ্রমের স্বীকৃতিতে
জোর প্রধানমন্ত্রীর
নারীদেরকে সমাজ পরিবর্তনের ‘গুরুত্বপূর্ণ চালক’ অভিহিত করে হিসাবের বাইরে থাকা নারীশ্রমের স্বীকৃতি দেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে নারীর ক্ষমতায়নের ওপর সংস্থাটির মহাসচিবের উচ্চ পর্যায়ের এক প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে এ কথা বলেন তিনি।
‘কাউকে পেছনে না রেখে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন’ শিরোনামে মঙ্গলবারের ওই গোলটেবিল আলোচনায় শেখ হাসিনা নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র ও তার সরকারের দেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ?’শিক্ষা, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সমান সুযোগে অংশ নেয়ায় নারীকে আমাদের সমর্থন দেয়া দরকার বলে আমরা বিশ্বাস করি।
‘রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নিম্নপর্যায়ের সব স্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে।’
নারী ক্ষমতায়নে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য-এসডিজি অর্জনে সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেয়া জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এতে আমরা নারীকে অর্থনৈতিক কর্মকা-ে জড়িত করায় অগ্রাধিকার দিয়েছি।
বাংলাদেশের নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের কেন্দ্রে নিয়ে আসায় বিচার ও নির্বাহী প্রশাসন, বেসামরিক ও সামরিক খাত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের সব চাকরিতে ১০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের বিষয়টি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

Authors
  
Top