শরণার্থী শিবির পরিদর্শন, ত্রাণ বিতরণ। রোহিঙ্গাদের দ্রম্নত ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান খালেদার

khalada zia 5

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ‘মানবতার খাতিরে’ দ্রম্নত ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি আরও বলেন, সরকারকে কূটনৈতিক তৎপরতা এবং মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করতে হবে। শুধু রিলিফ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
সোমবার দুপুরে উখিয়ার ময়নারগোনা রোহিঙ্গা শিবিরে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের পর সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। কক্সাবাজার সফরের তৃতীয় দিনে তিনি মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দেখতে যান। সেখানে ময়নারগোনা, হাকিমপাড়া, বালুখালী-২ রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মেডিকেল ক্যাম্প পরিদর্শন করেন।

এ সময় বেগম জিয়া শনিবার ফেনীর মোহাম্মদ আলী বাজারে তার গাড়ি বহরে হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এভাবে হামলা করে কোনো লাভ হবে না।

 

রোহিঙ্গাদের দেখতে খালেদা জিয়া শনিবার সড়কপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং রোববার রাতে কক্সবাজার আসেন। খালেদা জিয়া বলেন, মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে দেশে ফিরিয়ে নিতে হবে, তাদের সেখানে নিরাপদে ও নির্ভয়ে থাকতে দিতে হবে।
আন্ত্মর্জাতিক সংস্থা এবং প্রভাবশালী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা অবিলম্বে এই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে এবং তাদের নিজেদের ফিরিয়ে নিতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ান এবং সরকারকে জোর কূটনৈতি তৎপরতা চালাতে বলব। আন্ত্মর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এই দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা আবারও আন্ত্মর্জাতিক সংস্থার কাছে আপিল করছি, আপনারা শুধু কথা বললে হবে না, এটা কাজের মাধ্যমে দেখিয়ে দিতে হবে এবং বাংলাদেশের প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে।’
বেলা ১টার দিকে কক্সবাজার থেকে সড়কপথে উখিয়ার ময়নারগোনা শিবিরে আসেন। সেখানে তিনি কিছু রোহিঙ্গা পরিবারের হাতে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন। এরপর বিকাল ৪টায় তিনি ফের কক্সাবাজার সার্কিট হাউজে এসে বিশ্রাম নেন। রাতে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে চট্টগ্রামে রাত্রিযাপন করেন। আজ সকালে তিনি ঢাকার উদ্দেশে চট্টগ্রাম ছাড়বেন।
লন্ডন থেকে গত ১৮ অক্টোবর দেশে ফেরার পর এটি বিএনপি চেয়ারপারসনের জনসমক্ষে প্রথম বক্তব্য। আগস্টের ঘটনা শুরম্নর পর লন্ডন থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন রোহিঙ্গাদের সাময়িকভাবে আশ্রয় দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দেন।
দীর্ঘদিন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে রাখা সম্ভব নয় বলে মন্ত্মব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, নানা কারণে রোহিঙ্গাদের এখানে রাখা সম্ভব নয়। রোহিঙ্গারা পরিবেশ নষ্ট করছে, গাছ কাটছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। দীর্ঘদিন দেশের পক্ষে এটা বহন করা সম্ভব নয়। অতিদ্রম্নত এই রোহিঙ্গারা যাতে তাদের দেশে ফিরে যায়, সে জন্য মিয়ানমান সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে এবং তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে।
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এবং ১৯৯২ সালে তার (খালেদা জিয়া) সরকারের সময়ে নেয়া পদক্ষেপও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, জিয়াউর রহমানের সময়ও রোহিঙ্গারা এসেছিল। তখন আলোচনার মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল। ‘৯২ সালে বিএনপির সরকারের সময়ও এসেছিল। তখন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করেছেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, সরকার এখনো পর্যন্ত্ম কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। সরকারকে অবিলম্বে উদ্যোগ নিতে হবে। মিয়ানমার সরকারকে আহ্বান, মানবতার স্বার্থে নিজ দেশের মানুষকে নিজের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন এবং তাদের সেখানে নিরাপত্তা ও নাগরিতকত্বসহ থাকার ব্যবস্থা করবেন।
রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার বিষয়টি উলেস্নখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ গরিব এবং এটি একটি ছোট দেশ। এ দেশের মানুষের মন আছে ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা আছে। সে জন্য তারা গরিব হয়েও নিজের পকেট থেকে যে যেভাবে পারছে তাদের (রোহিঙ্গা) সাহায্য করছে, তাদের কষ্ট ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে।
খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, সরকারের যেভাবে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত ছিল, সেভাবে তারা তা করেনি ও করছে না। বরং যারা কাজ করতে চায় তাদেরও নানাভাবে বাধা দিচ্ছে।
খালেদা জিয়ার রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের সময় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরম্নল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরম্নল ইসলাম খান, আমীর খসরম্ন মাহমুদ চৌধুরী, জ্যেষ্ঠ নেতা আবদুলাহ আল নোমান, বরকত উলস্নাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, মীর মোহাম্মদ নাসির, শামসুজ্জামান দুদু, আমান উলস্নাহ আমান, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, গোলাম আকবর খন্দকার, জয়নুল আবদিন ফারম্নক, আবদুস সালাম, মাহবুবউদ্দিন খোকন, খায়রম্নরল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, মাহবুবুর রহমান শামীম, স্থানীয় সাবেক সাংসদ লুৎফর রহমান কাজল, হাসিনা আহমেদ, জেলা সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক শামীম আরা স্বপ্না, কাজী আবুল বাশার, বজলুল বাসিত আনজু, আহসান উলস্নাহ হাসান, সাইফুল আলম নীরব, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, শফিউল বারী বাবু, আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল প্রমুখ নেতা ছিলেন।
এরপর বালুখালীতে ড্যাবের ক্যাম্প পরিদর্শন করতে গিয়ে খালেদা জিয়া আরও বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে আমি ধন্যবাদ জানাব তারা সুন্দরভাবে রিলিফ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বিএনপির নেতা-কর্মী ও উখিয়ার জনগণকেও ধন্যবাদ জানান তারাও রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিএনপি রোহিঙ্গাদের পাশে আছে, থাকবে, আমরা রিলিফ কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। প্রথম থেকে আমাদের ড্যাব (ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন) মেডিকেল ক্যাম্প করে কাজ করছে।’
তিনি বলেন, একটা মানবতার কাজে উখিয়ায় এসেছি। আমরা রোহিঙ্গাদের দেখার জন্য, তাদের কিছু সাহায্য করার জন্যই এখানে আসতে চেয়েছি। সেই আসার পথে বহরে হামলা করা হয়েছে এবং অনেক সাংবাদিক আহত হয়েছেন। কারা আহত করেছে, কারা হামলা করেছে সরকার তা জানে। তাদের ছবিও দেখানো হয়েছে। সরকারকে বলব এগুলো বন্ধ করতে। এগুলো করে লাভ হবে না। বরং এগুলো করে সরকার সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এ সব বাদ দিয়ে অতন্ত্মপক্ষে মানবতার খাতিরে সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
আবেগাপস্নুত খালেদা: ময়নারগোনায় রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে এক শিশু-কন্যার কান্না থামাতে গিয়ে নিজেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া। এ সময় শিশুটিকে কোলে তুলে আদর করেন তিনি।
ত্রাণ বিতরণের পর রোহিঙ্গা শিবিরের একটি ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা একদল নারীকে দেখে তাদের খোঁজ-খবর নিতে এগিয়ে যান খালেদা জিয়া। সেখানে আমিরা নামে কম বয়েসী একজন নারী শিশু কন্যাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময়ে শিশু কন্যাটি কাঁদতে থাকে। ঠিক তখনই সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাকে সান্ত্ম্বনা দেন। আমিরার কোলে শিশু কন্যা ডোয়েনের কান্না থামাতে আবেগপ্রবণ হয়ে নিজে কোলে তুলে নেন এবং আদরের পরশ দেন।

Authors
  
Top