সমস্ত দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে শেষ করে জীবনের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন সিঙ্গাপুরের রূপকার লি কুয়ান ইউ

Lee Kuan

সম্প্রতি এক সাক্ষাত্কারে লি কুয়ান বলেছিলেন, স্বাধীনতা লাভের সময় আমাদের একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার মতো প্রয়োজনীয় আর কিছুই ছিল না। সেটাই আমি করেছি; আর তাই আজ আমরা এ অবস্থায় এসেছি। ইতিহাস বেশ লম্বা একটি সময়। আর আমি বোধহয় আমার ভূমিকাটি ঠিকভাবেই পালন করতে পেরেছি।

সমস্ত দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে শেষ করে জীবনের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন সিঙ্গাপুরের রূপকার লি কুয়ান ইউ। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় গতকাল লি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ওই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তার বড় ছেলে লি সিয়েন লং সিঙ্গাপুরের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। সোমবার তার কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী গভীর দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছেন, সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ মারা গেছেন।
১৯৫০-এর দশকের দিকে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে একে একে মুক্ত হচ্ছিল। সেই সময় ১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে মালয়েশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় সিঙ্গাপুর। কিন্তু মাত্র দুই বছরেই ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট স্বাধীন দেশ মালয়েশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয় সিঙ্গাপুর। উপনিবেশিক শাসন থেকে সদ্য মুক্তি পাওয়া সমস্যায় জর্জরিত দরিদ্র সিঙ্গাপুরের দায়িত্ব তখন শক্ত হাতে ধরেছিলেন লি কুয়ান ইউ।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৭১৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বন্দর শহর থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপ নেওয়া সিঙ্গাপুর ৩১ বছর শাসন করেন তিনি। তার নেতৃত্বে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি থেকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মাথাপিছু আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে ৫৫ লাখ মানুষের দেশ সিঙ্গাপুর। এ কারণে তাকে বলা হয় আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক। জন্মলগ্নে দেশের দায়িত্ব নিয়েই লি কুয়ান প্রথমেই মনোযোগ দিয়েছেন রাজনৈতিক স্থিরতা নিশ্চিতের বিষয়ে। তার রূপায়ণ তিনি করেছিলেন সরকারি নানা নীতিতে।

শুরুতেই লি কুয়ান রাজনৈতিক স্থিরতা ও ক্ষমতার রদবদলজনিত অস্থিরতা ঠেকাতে চেয়েছিলেন। আর তাই তার গৃহীত নীতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য কঠোর হন লি। এজন্য বিরোধীদের কার্যত দমন করার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৫৯ সাল থেকে প্রতিটি নির্বাচনেই জয়ী হয়ে আসছে লি কুয়ানের প্রতিষ্ঠা করা রাজনৈতিক দল দি পিপলস অ্যাকশন পার্টি (পিএপি)। বর্তমানেও পার্লামেন্টের ৮৭টি আসনের মধ্যে ৮০টিই এর দখলে। এই সাফল্যের জন্য বিশ্বে তিনি যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা এবং বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগে হয়েছেন সমালোচিত।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারসাম্য বজায় রেখেছেন লি। এ প্রসঙ্গে সিঙ্গাপুরের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব বিলাহারি কৌসিকান বলেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা প্রয়োজন। এটিই আপনাকে নিয়ে যাবে সেই স্তরে। সুতরাং রাষ্ট্রনায়ককে অবশ্যই বাস্তবতার নিরিখে পথ চলতে হবে। তাকে বুঝতে হবে যে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে না। তবে তা অবশ্যই কিছু প্রাথমিক নীতি মেনে চলবে। এটির সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন লি কুয়ান ইউ। আর তাই তার নেতৃত্বে সিঙ্গাপুর আজ বিশ্বের ধনী ও উন্নত দেশগুলোর কাতারে উঠে এসেছে।

লি কুয়ান কিন্তু তাই বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সবসময় সমঝোতা করে চলেননি। যখন প্রয়োজন মনে হয়েছে, তখন তিনি ইস্পাত কঠিন চরিত্রের এক রাষ্ট্রনায়ক। ১৯৭১ সালে সিঙ্গাপুর থেকে ব্রিটিশ বাহিনীর সামরিক ঘাঁটি প্রত্যাহারের ঘটনাতেই তা প্রমাণিত হয়। সেক্ষেত্রে নিজ দেশের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তাকেই তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ২০০৯ সালে দেওয়া এক বক্তব্যে লি কুয়ান বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বন্ধুত্ব তৈরিতে আপনার দেশের সুনাম বা রাষ্ট্রনায়কের ব্যক্তিগত ‘ক্যারিশমা’ দীর্ঘস্থায়ী কোনো প্রভাব রাখে না। বন্ধুত্ব করতে হলে আপনার দেশ যে অন্যের কাছে প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়-তা আপনাকে প্রমাণ করতে হবে। এজন্য প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের নিজেদের অবস্থান শক্ত রেখেই পরিবর্তন করতে হবে। তবেই আন্তর্জাতিকভাবে একটি দেশ প্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে। তখন অবশ্যই অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র তাদের প্রয়োজনের খাতিরেই আপনার বন্ধু হয়ে উঠবে। বিবিসি, ওয়াশিংটন পোস্ট।

Authors
Top