সোহরাওয়ার্দীর সমাবেশে খালেদা জিয়ার ঘোষণা, হাসিনার অধীনে নির্বাচন হবে না

khalada zia 5

শেখ হাসিনার অধীনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেতে আপত্তির কথা আবারও জানিয়ে দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না। তাই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। এছাড়া নির্বাচনে ইভিএম বাতিল এবং ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়ে সেনা মোতায়েন করতে হবে।
১৯ মাস পর রাজধানীতে আয়োজিত জনসভায় সংকট মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্যের ডাক দেয়ার পাশাপাশি ক্ষমতায় যেতে পারলে উন্নয়ন ও জনমুখী বিভিন্ন কর্মকা- করার প্রতিশ্রম্নতি দেন বিএনপিপ্রধান। প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন খালেদা জিয়া।

রোববার বিকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি আয়োজিত  সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে দুপুর ২টার দিকে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশ শুরম্ন হয়। সমাবেশে সভাপতিত্বে করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরম্নল ইসলাম আলমগীর। সমাবেশ শুরম্নর এক ঘণ্টা পর সমাবেশস্থলে পৌঁছান খালেদা জিয়া। এ সময় চারদিক থেকে তার ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নামে বিভিন্ন স্স্নোগান দিয়ে নেতাকর্মীরা মুখরিত করে তোলেন উদ্যান। খালেদা জিয়া হাত উঁচিয়ে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। ৭ নভেম্বর ‘বিপস্নব ও জাতীয় সংহতি দিবস’ উপলক্ষে এ সমাবেশ ডাকা হলেও বর্তমান রাজনৈতিক ও সার্বিক অবস্থার উপর বক্তব্য রাখেন খালেদা জিয়া ও দলের নেতারা। এমনকি তা মঞ্চের ব্যানারেও স্পষ্ট তুলে ধরা হয়। মঞ্চের ব্যানারে লেখা হয়- ‘৭ নভেম্বর জাতীয় বিপস্নব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরম্নদ্ধার ও অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে জনসভা।’
এদিকে প্রায় ১৯ মাস পর রাজধানীতে সমাবেশের অনুমতি পেয়ে উজ্জীবিত বিএনপির নেতাকর্মীরা সকাল থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ঢল নামে সেখানে। সমাবেশকে কেন্দ্র করে আশপাশের পুরো এলাকায়ও নামে নেতাকর্মীদের জনস্রোত। এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে উদ্যান ও এর আশপাশ। শাহবাগ, কাকরাইল, খামারবাড়ি, টিএসসি মোড়, মৎস্য ভবন, দোয়েল চত্বর, পলাশী এসব এলাকা দিয়ে দলে দলে মিছিল নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করে তারা। এছাড়া ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীরা জনসভায় সকাল থেকে আসতে থাকেন। এ জন্য বেলা ১১টা থেকে সমাবেশ শুরম্নর আগ পর্যন্ত্ম মঞ্চে জাসাসের শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন।
জনসভার জন্য উদ্যানে ৬০ ফুট লম্বা ও ৩০ ফুট প্রশস্ত্ম মঞ্চ নির্মাণ করে বিএনপি। মঞ্চের চারপাশে বসানো হয় সিসি টিভি ক্যামেরা। মঞ্চের সামনে ৩০ ফুট জায়গায় বেষ্টনী দেয়া হয়। মঞ্চ ও এর আশপাশের ল্যাম্পপোস্ট এবং বিভিন্ন গাছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি এবং বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের ছোট-বড় নেতাকর্মীদের পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন শোভা পায়।
বক্তব্যের শুরম্নতে সমাবেশে নেতাকর্মীদের আসতে বাধা দেয়ার অভিযোগ করেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, অনুমতি দেয়া হলেও সমাবেশমুখী মানুষদের রাস্ত্মায় রাস্ত্মায় বাধা দেয়া হয়েছে। হোটেল ও বাড়ি বাড়ি তলস্নাশি চালানো হয়। এমনকি তাকেও বাধা দেয়া হয়েছে। তিনি যাতে সমাবেশে আসতে না পারেন সে জন্য গুলশানের বাড়ি থেকে বের হয়ে দেখেন রাস্ত্মায় যাত্রীহীন গাড়ি ফেলে রেখে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। এমন করে সরকার ছোট মনের পরিচয় দিয়েছে।
বিকাল ৪টা ১০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারপারসন জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রে মতপার্থক্য থাকবে। তারপরও জনগণের জন্য এক হয়ে কাজ করে দেশের উন্নয়ন করতে হবে। অনুপস্থিত গণতন্ত্র, কথা বলার অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করতে হবে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি করবে না। আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে।
তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগ আবারও একদলীয় বাকশালের মতো অঘোষিতভাবে একদলীয় বাকশাল কায়েম করতে চায়। মানুষ গুম-খুন করছে। জেলখানা বিএনপি লোক দিয়ে ভরে রাখা হয়েছে। নেতাকর্মীদের মামলা দিচ্ছে। তাদের লোকজন খুন করেও মাপ পেয়ে যাচ্ছে। তারপরও তিনি ক্ষমা করে দিতে চান। কিন্তু জনগণ রাজি নয়। তারপরও সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চান। তারপরও রাজনীতির সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চান। মানুষও পরিবর্তন চায়। এ পরিবর্তন ভোটের মাধ্যমে আসতে হবে। এ জন্য মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। কারণ, শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না, হবে না। তারা বুঝে না, চুরি করে জেতার মধ্যে আনন্দ নেই।
নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে তিনি বলেন, তার দল সংস্কার প্রস্ত্মাব দিয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। তাদের টহল দেয়ার অনুমতি দিতে হবে। ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) বন্ধ করতে হবে। কিন্তু সরকার যাচ্ছে ইসি তাই করতে চাচ্ছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং নানা অনিয়মের সরকারের সমালোচনা করে বিএনপিপ্রধান বলেন, ১০ টাকার চাল খাওয়ানোর কথা, এখন তা ৭০ টাকা। সবজির দাম ৭০ টাকার কম নয়, পেঁয়াজ ৮০ টাকা। কৃষকদের ভয় দেখিয়ে চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিদু্যৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। ঘরে ঘরে চাকরি দেয়ার কথা বলে ঘরে ঘরে বেকার সৃষ্টি করা হচ্ছে। উন্নয়নের নামে লুটপাট চলছে। ব্রিজ নির্মাণ করতে ইউরোপ-আমেরিকার চেয়ে ব্যয় বেশি করছে। শিক্ষাঙ্গন নিয়ন্ত্রণ করছে ছাত্রলীগ। শিক্ষকদের মারধর করা হয়েছে। নারী ও শিশুদের গণঅত্যাচারে নতুন নতুন পদ্ধতি ‘আমদানি’ করছে সরকার। ট্রাকে ও বাসে গণঅত্যাচারও করা হচ্ছে।
অর্থনীতি ধ্বংসের পথে এমন মন্ত্মব্য করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুইস ব্যাংকে তাদের মন্ত্রী-এমপিরা টাকা পাচার করছে। ২০১৫ সালে দেশের বাইরে ৫ হাজার কোটি টাকা গেছে। জিএফআইয়ের তথ্য মতে, গত ১০ বছরে সাড়ে ৪ লাখ টাকা পাচার হয়েছে।
এসবের তদন্ত্ম না করায় দুদকের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দুদক এসব দেখে না। পানামা কেলেঙ্কারির তদন্ত্ম করছে না। বিএনপি জড়িত না থাকলেও শুধু তাদের পেছনে আছে। সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা চুরি করলেও তাদের পেছনে হাত তো দূরের কথা, চোখও যায় না।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে ‘চাপ’ দিয়ে পদত্যাগ করানো হয়েছে বলে অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আজকে বিচার বিভাগের কী অবস্থা আপনারা দেখেছেন। প্রধান বিচারপতিকে পর্যন্ত্ম জোর করে অসুস্থ বানিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। দেশের বাইরে পাঠিয়ে শুধু নয়, দেশের বাইরে এজেন্সির লোক পাঠিয়ে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।’
খালেদা জিয়া বলেন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার ‘সত্যি কথা’ বলেছেন বলে তার ওপর সরকারের এই রকম আচরণ। সত্য কথা বলেছিলেন বিধায় তাকে আজকে বিদায় নিতে হয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরম্নল বলেন, খালেদা জিয়া ছাড়া এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না। বর্তমান সরকার জনগণের ভোটের অধিকার লুট করেছে। রাজস্ব লুট করেছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে খালেদা জিয়াকে হয়রানি করছে। জনগণ এর বিচার করবে। আওয়ামী লীগ নেতারা লুট করে টাকা বিদেশে জমাচ্ছে উলেস্নখ করে ফখরম্নল বলেন, এদের জনগণের আদালতে হাজির করে বিচার করা হবে।
মির্জা ফখরম্নল বলেন, জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বর একদলীয় শাসন ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেছিলেন। তারই উত্তরসূরি খালেদা জিয়া নয় বছর স্বৈরাচারের বিরম্নদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। আজকে দখলদার-লুটেরা সরকারে বিরম্নদ্ধে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, শেখ হাসিনার দিন শেষ। দেশের মানুষ আর তাকে দেখতে চায় না। আর হাসিনার অধীনে নির্বাচন হলে সে নির্বাচনে বিএনপি যাবে না।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, বিচার বিভাগের মানসম্মান সরকার ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। প্রধান বিচারপতি ষোড়শ সংশোধনী রায়ে দুর্নীতির কথা বলেছেন। এ জন্যই প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এ আচরণ করা হলো।
তিনি বলেন, ২৩টি শর্তে বিএনপিকে এ সমাবেশের অনুমতি নিতে হয়েছে। এ শর্ত ও অনুমতি প্রমাণ করে দেশে গণতন্ত্র নেই। বৃহত্তম রাজনৈতিক দলকে অনুমতি নিয়ে সমাবেশ করতে হয়। এমন একদিন আসবে যেদিন অনুমতি ছাড়াই জনগণের স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাবেশ করবে। জিয়াউর রহমান মার্শাল ল দেননি, ক্রু করেননি, কোনো সংসদ ভেঙে দেননি বলেও দাবি করেন বিএনপির এ নেতা।
সমাবেশের অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরম্নল ইসলাম খান, আমির খসরম্ন মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুলস্নাহ আল নোমান, বরকত উলস্নাহ বুলু, মীর নাছির, আহমেদ আজম খান, শওকত মাহমুদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রম্নহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল প্রমুখ।

Authors
Top